সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে পড়ে আদিবাসীদের নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটল নির্বাচন কমিশন। ‘নো-ম্যাপড’ হয়ে থাকা আদিবাসীদের বৈধতা দিতে বাধ্য হচ্ছে তারা। নোটিস পাওয়া এসসি এবং এসটিদের নামের তালিকা প্রতিটি জেলার কাছে চেয়ে পাঠানো হয়েছে। তাদের বৈধ ভোটারের স্বীকতি দিতে সমস্যা নেই বলে জানানো হয়েছে।
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০২সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় বহু আদিবাসী এবং তফসিলি ভোটারদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া লজিকাল ডিসক্রিপেন্সিতে নাম থাকায় অনেকের ডাক পড়ে। শুধু পূর্ব বর্ধমান জেলাতেই ১০হাজারের বেশি এসসি এবং এসটি ভোটার নো-ম্যাপড হয়েছিলেন। এছাড়া হুগলি, বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার মতো জেলাগুলিতেও আদিবাসী নো-ম্যাপড ভোটারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তার প্রতিবাদে তৃণমূলের আদিবাসী সংগঠন আন্দোলনে নামে। বর্ধমানে তারা ১০দিন ধরে অনশন করে। এছাড়া কমিশনের কাছেও কড়া ভাষায় চিঠি পাঠানো হয়। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে একজন আদিবাসীর নাম বাদ গেলে দিল্লির অফিস ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। তারপরই কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের আদিবাসী নেতা দেবু টুডু বলেন, আদিবাসীরা এদেশের সবচেয়ে পুরানো জাতি। আমাদের পূর্বসূরীরাই এদেশকে বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন। সেটা সকলেরই জানা। শুধু জ্ঞানেশ কুমার জানতেন না। চাপে পড়ে তাঁর শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। আমরা চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলাম, চূড়ান্ত তালিকায় আমাদের একজনের নাম বাদ গেলেও বৃহত্তর আন্দোলন হবে। শেষ পর্যন্ত কমিশন মানলেও এভাবে আদিবাসীদের হয়রানি করার কোনও যুক্তি ছিল না।কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আদিবাসীদের অনেকেই কমিশনের ঠিক করে দেওয়া নথিগুলি দেখাতে পারেননি। তাঁদের অনেকে ২০০২ সালের ভোটার ছিলেন না। কারও বাবা বা দাদু ২০০২ সালের আগেই মারা গিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ চলে গিয়েছে। বহু আদিবাসীর কাছে এসটি সার্টিফিকেট নেই। সেক্ষেত্রে তাঁদের নাম বাদ যাওয়া নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল লাগাতার চাপ তৈরি করায় কমিশনের টনক নড়ে।
শাসকদলের দাবি, আদিবাসীদের জীবনযাপন সম্পূর্ণ অন্যরকম। এদেশের বৈধ নাগরিক প্রমাণ দেওয়ার জন্য তাদের কোনও নথি দেখানোর প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ আদিবাসীই কাগজপত্র গুছিয়ে রাখেন না। আদিবাসীদের নির্দিষ্ট কয়েকটি পদবি রয়েছে। তা দেখে তাঁদের সহজেই চিহ্নিত করা যায়। তারপরও নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের হয়রানি করেছে। লাগাতার আন্দোলনের জেরে কমিশন পিছু হটতে বাধ্য হওয়ায় বিষয়টিকে আদিবাসীরা তাঁদের নৈতিক জয় হিসেবেই দেখছেন। তবে আদিবাসীদের নিয়ে বিজেপির মাথাব্যথা ছিল না। তারা কোনওদিনই এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেনি। কমিশনে একটি চিঠি পর্যন্ত পাঠায়নি। যদিও বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন, বৈধ ভোটারদের নাম যাতে কোনওভাবেই বাদ না যায় তারজন্য আমরা প্রথম থেকেই দাবি জানিয়ে আসছি। আদিবাসীরা যে এদেশের বাসিন্দা, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কমিশনের এক আধিকারিক বলেন, আদিবাসীদের এসআইআরের আওতায় আনা উচিত হয়নি। কাজ ছেড়ে তাঁদের শুনানির লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। তাঁদের বৈধতা নিয়ে কোনও সংশয় থাকা উচিত ছিল না। তাই এই সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া যেত।