সুপ্রকাশ মণ্ডল
এ বার একটা ঋণ, মানে লোনের মডেলের কথা বলা যাক।
কোনও এক ব্যবসায়ী ঋণের আবেদন করলে, ব্যাঙ্ক তাঁর নথিপত্র খতিয়ে দেখে। তার ভিত্তিতে ঋণের আবেদন মঞ্জুর বা নামঞ্জুর হয়। মঞ্জুর করলে বিনিময়ে ব্যাঙ্কের কাছে তাঁকে কোনও সম্পত্তি গচ্ছিত রাখতে হয়। ঋণের পেলে মাসে মাসে কিস্তিতে সুদ-সহ সেই ঋণ তাঁকে শোধ করতে হয়। ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে ব্যাঙ্ক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়। এই হলো চলতি ঋণ ব্যবস্থার একটা মোটামুটি মডেল। এখানে নীরব মোদী বা বিজয় মালিয়ার ঋণ মডেল আলোচ্য নয়!
তেমন এক লোনের গল্প শোনা যাক। দক্ষিণ শহরতলির বারুইপুরের জনৈক পরেশের একটি ছোট্ট সাইকেল মেরামতের দোকান রয়েছে। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য তিনি ঋণ নেবেন বলে ঠিক করলেন। প্রথমে গেলেন বাড়ির কাছে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে। কিন্তু গত তিন বছরের ইনকাম ট্যাক্স (আইটি) রিটার্নের ফাইল তাঁর কাছে না–থাকায় শেষে ঋণের আবেদন নাকচ হয়। এ বার তিনি যান একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের শাখায়। সেখানে পরেশের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর ব্যাঙ্ক ডিটেলস এবং অন্য যে সব নথি চাওয়া হলো, তাতে রণে ভঙ্গ দিলেন তিনি। তেমনই এক সময়ে তাঁর দোকানে এসে হাজির হন এক ব্যক্তি। তিনি পরেশকে ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো বাইপাসের ধারে একটি অফিসে। আধার কার্ড, প্যান কার্ডের কপি, ব্যাঙ্ক ডিটেলসের পাশাপাশি অন্য কয়েকটি নথি সেখানে জমা দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ঋণ মঞ্জুরও হয়ে গেল। সপ্তাহান্তে এসে নিজের বায়োমেট্রিক (ফিঙ্গার প্রিন্ট, চোখের মণির প্যাটার্ন) ডিটেলস যাচাইয়ের পরেই তাঁর অ্যাকাউন্টে ঢুকে যায় ২৫ হাজার টাকা। পরের সপ্তাহে বাকি ৭৫ হাজার টাকা। সুদ সমেত সেই টাকা তাঁকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে শোধ দিতে বলা হয় ওই এজেন্টের কাছে। মাস ছয়েক টাকা শোধ দেওয়ার পরে সেই এজেন্ট আর আসেননি পরেশের কাছে। বাকি টাকাও আর শোধ দিতে হয়নি। এ কেমন ঋণ!
সেটা জানতে আরও বছর দেড়েক লাগে পরেশের। তাঁর দোকানে এসে হাজির হন পুলিশ এবং কমার্শিয়াল ট্যাক্স বিভাগের আধিকারিকেরা। পরেশ নাকি ১৬ কোটি টাকা জালিয়াতি করেছেন! ভাগ্য ভালো যে, পুলিশ তাঁকে গারদে পোরেনি। তার কাছ থেকে সব জানার পরে পরেশকে বলা হয়, যারা তাকে ঋণ দিয়েছিল, তাদের নামে এফআইআর করুন তিনি, তা না হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। শেষ পর্যন্ত বারুইপুর থানায় তিনি এফআইআর করেন তিন জনের নামে।
পুলিশ সূত্রে খবর, পরেশের নথি এবং বায়োমেট্রিক প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর নামে একটি কোম্পানি তৈরি করা হয়েছিল। করা হয়েছিল জিএসটি রেজিস্ট্রেশনও। খাতায়কলমে পরেশ সেই কোম্পানির ডিরেক্টর। সেই শেল কোম্পানি আরও কয়েকটি ভুয়ো কোম্পানির (পরেশের মতোই আরও কয়েকজন ব্যক্তির নামে তৈরি) সঙ্গে কাগুজে ব্যবসা করে জিএসটি-র ইনপুট ট্যাক্স রিটার্নের নামে ১৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে!
কমার্শিয়াল ট্যাক্স বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই জালিয়াতির জন্য সরকারের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এমন চক্রগুলি চালাচ্ছে। সরকার যে কোনও পণ্যের কাঁচামাল এবং সার্ভিসের উপরে ইনপুট ট্যাক্স আদায় করে। সেই পণ্যটি বিক্রির পরে সরকার আউটপুট ট্যাক্স পায়। আউটপুট ট্যাক্স সরকারের ঘরে জমা পড়লে, খুচরো বা শেষ বিক্রেতাকে তারা ইনপুট ট্যাক্সের টাকা ফেরত দেয়। কিন্তু শেল কোম্পানির ব্যবসায় কোনও পণ্য হাতবদল হয় না। শুধু ভুয়ো ইনভয়েস বা বিল তৈরি করে ইনপুট ট্যাক্স হাতিয়ে নেওয়াই হলো এদের উদ্দেশ্য।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে, এমন জালিয়াতি ধরা পড়ে না কেন? কারণ, এই শেল কোম্পানিগুলির স্থায়িত্ব বড়জোর ছ’মাস। তার মধ্যেই তারা কোটি কোটি টাকা জালিয়াতি করে সরকারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়। তার পরে সেই কোম্পানিগুলির কোনও অস্তিত্ব থাকে না। সারা দিনে লক্ষ লক্ষ ইনভয়েস আপলোড হয় বাণিজ্য কর বিভাগের পোর্টালে। সেগুলি যাচাই করতে কখনও কখনও ছ’মাস ছাড়িয়ে যায়। ততদিনে যা ঘটার ঘটে যায়। সম্প্রতি তেমন বেশ কিছু জালিয়াতি নজরে এসেছে রাজ্যের বাণিজ্য কর বিভাগের। বর্তমানে নথি যাচাইয়ের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা হচ্ছে। তাতে গরমিল দ্রুত ধরা পড়ছে। কোনও একটি বিশেষ সময়ে কোন সংস্থার বেশি ব্যবসা হয়েছে, কারা সব থেকে বেশি ইনপুট ট্যাক্স ফেরত পেয়েছে— এআই-এর খুঁজে দেওয়া ডেটা অ্যানালিসিস করে গরমিল ধরা আগের থেকে সহজে ধরা পড়েছে।
পরেশের মতো আরও অনেকের খোঁজ মিলেছে, যাঁরা জানেনই না যে, তাঁদের নামে কত কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর, হাওড়ার সালকিয়া, দুই মেদিনীপুরে এই চক্র বেশি সক্রিয়। কলকাতা পুলিশের ডিরেক্টরেট অফ ইকোনমিক অফেসেন্স জানিয়েছে, সম্প্রতি যে জালিয়াতদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে, তারা আপাতত বেপাত্তা। গত সাড়ে পাঁচ মাসে প্রায় ৪০০-৫০০ কোটি টাকার জালিয়াতির সন্ধান মিলেছে।
কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এই পুরো জালিয়াতির পিছনে আসল মাথা হলো কয়েকজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ)। জিএসটি সিস্টেমের ফাঁকফোকর খুঁজে তাঁরাই নিত্যনতুন জালিয়াতির পথ বাতলে দেন। জিএসটি নম্বর তৈরি থেকে কোম্পানি ফর্মেশন— সব কিছু তাঁরাই করে দেন। বিনিময়ে মোটা অর্থ পান তাঁরা। বেপাত্তা জালিয়াতদের সন্ধান পুলিশ না পেলেও কলকাতার কয়েকজন সিএ-র কথা জানতে পেরেছে তারা। জালিয়াতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কাজ চলছে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করা হয়েছে। কিন্তু তার থেকে বেশি চিন্তার ব্যাপার, শেল কোম্পানির পাশাপাশি কিছু নামজাদা কোম্পানিও এই ধরনের জালিয়াতি করছে বলে নজরে এসেছে বাণিজ্য কর বিভাগের। শহরে অভিজাত আবাসন তৈরি করে, এমন একটি রিয়েল এস্টেট সংস্থা নির্মাণ সামগ্রীর ভুয়ো বিল কিনে কোটি কোটি টাকা ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট জালিয়াতি করেছে। তবে সেই সংস্থাকে বিষয়টি জানানো মাত্র, সুনাম রক্ষার্থে তারা ওই করের টাকার সঙ্গে জরিমানার টাকা দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি করেছে। প্রশ্ন হলো, যেগুলি নজরে আসেনি, সেই জালিয়াতির অঙ্ক কত? তার জবাব আপাতত নেই। (শেষ)