লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা অন্যের অ্যাকাউন্টে! পাঁচ বছরেও মেলেনি সাহায্য
আনন্দবাজার | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্বামী বাতে প্রায় পঙ্গু। অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সাত বছর তিনি বাড়িতে বসে। তার উপরে বাড়িতে রয়েছেন দুই বিধবা ননদ। কেটারিং-এর আনাজ কেটে যেটুকু আয় হয়, তা দিয়ে চার জনের পেট চালাতে হিমশিম খেতে হয় সংসারের হেঁশেল সামলানো কবিতা মণ্ডলকে। কার্যত নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা। কিন্তু তা সত্ত্বেও মধ্য হাওড়ার বাসিন্দা কবিতার কপালে রাজ্য সরকারের দেওয়া লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা জোটেনি। সরকারি ভাবে তাঁর নাম লক্ষ্মীর ভান্ডারে নথিভুক্ত হওয়ার পরেও গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর নামে বরাদ্দ টাকা জমা পড়ছে কোনও অজানা ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। সমস্যা মেটাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক এবং জেলা প্রশাসনের সমাজকল্যাণ দফতরে বছরের পর বছর ঘুরলেও লক্ষ্মীর ভান্ডারের প্রকৃত দাবিদার এই মহিলার সমস্যার সুরাহা আজও হয়নি।
সমস্যা শুরু হয় ২০২১ সাল থেকে। মধ্য হাওড়ার নেতাজি সুভাষ রোডের পাশে গৌড়ীয় মঠ এলাকায় একটি ভাড়া বাড়ির বাসিন্দা কবিতা সে বছর লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য লাইন দিয়ে ফর্ম তুলে আবেদন করেন। তাঁর আবেদন সরকারি ভাবে মঞ্জুরও হয়। কিন্তু পরে যখন বাকি মহিলারা ভাতা পেতে শুরু করেন, তখন তিনি দেখেন, তাঁর অ্যাকাউন্টে কোনও টাকা জমা পড়েনি।
এর পরেই তিনি গ্রামীণ ব্যাঙ্কে তাঁর অ্যাকাউন্টে টাকা কেন ঢুকছে না, তা জানতে যান। কিন্তু ব্যাঙ্ক থেকে জানানো হয়, সমস্যা আসলে জেলা সমাজকল্যাণ দফতরের। কারণ সেখান থেকেই এই ভাতার বিষয়টি দেখা হয়। কবিতা বলেন, ‘‘এর পরে আমি জেলা সমাজকল্যাণ দফতর ও আমার গ্রামীণ ব্যাঙ্কে ছুটে বেড়িয়েছি। কিন্তু কেউ কোনও সাহায্য করেনি। উপরন্তু, আমাকে প্রায় তাড়িয়ে দিয়েছে।’’
কবিতা জানান, অসুস্থ স্বামী মন্টু মণ্ডল ও দুই ননদকে নিয়ে সংসার চালাতে তাঁর নাজেহাল অবস্থা। সে কথা জানা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের থেকে কোনও সাহায্য মেলেনি। এমন সময়ে এক শুভানুধ্যায়ীর সাহায্যে নিজের আধার কার্ড থেকে লক্ষ্মীর ভান্ডারের তথ্য ঘেঁটে কবিতা জানতে পারেন, প্রতি মাসে তাঁর নামে বরাদ্দ ভাতা তাঁর অ্যাকাউন্টে না এসে জমা পড়ছে কোনও অচেনা ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে! মাসের পর মাস সেই ঘটনা ঘটে চলেছে।
‘‘২০২১ সালে লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে দেওয়া ওই ৫০০ টাকাও আমার সংসারে খুবই প্রয়োজন ছিল। তাই আমি বার বার আমার ব্যাঙ্কে ও সমাজকল্যাণ দফতরে ছুটে বেড়িয়েছি। প্রথমে আমাকে বার বার আশ্বাস দেওয়া হয়, সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু কিছুই হয়নি। পাঁচ বছর পরে এখন সমাজকল্যাণ দফতর থেকে বলা হচ্ছে, কী ভাবে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা যাচ্ছে, তা তারা জানে না। আমাকে নতুন করে আবেদন করতে হবে। কিন্তু আমি কেন করব? আমার প্রাপ্য টাকা পাব না কেন?’’— ক্ষোভ উগরে বলছেন কবিতা।
দফায় দফায় চিঠি লিখে, জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে এই সমস্যা মেটানোর অনুরোধ করেছেন কবিতা। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।
এ বিষয়ে জেলা সমাজকল্যাণ দফতরের এক আধিকারিকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘‘এই অভিযোগ পাওয়ার পরে যে ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে ওই টাকা এত দিন জমা পড়েছে, তাঁকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁকে সমাজকল্যাণ দফতরে বার বার ডেকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি আসেননি। সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাঁর অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো বন্ধ করে কবিতার অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে।’’
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নিতে পাঁচ বছর লাগল কেন? গত পাঁচ বছরের প্রাপ্য বকেয়া টাকা কবিতা আদৌ কবে পাবেন? দফতরের থেকে এর উত্তর অবশ্য মেলেনি।