• তিন বছরেও সারেনি রোগ, ‘মৃত্যুপথ’ বদলাতে একাধিক পদক্ষেপ পুলিশের
    আনন্দবাজার | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • তিন বছর বাদে ফের আলোচনার কেন্দ্রে ডায়মন্ড হারবার রোডের বেহালা চৌরাস্তা এবং সংলগ্ন এলাকা। পর পর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা সেখানে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, বছর তিনেক আগে স্কুলের পথে লরির চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যু হওয়া, বছর আটেকের সৌরনীল সরকারের ঘটনা কি কিছুই বদলাতে পারেনি? ভুক্তভোগী থেকে ওই এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেরই দাবি, সে সময়ে দিনকয়েক আলোচনা চলেছিল। পুলিশ পথ নিরাপত্তা বাড়াতে কিছু পদক্ষেপও করে। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ফের যে কে সে-ই অবস্থা। এর ফলেই বাসন্তী হাইওয়ের পরে এই ডায়মন্ড হারবার রোডই পথ দুর্ঘটনার জেরে সবচেয়ে ‘কুখ্যাত’ হিসাবে উঠে এসেছে পুলিশি রিপোর্টে। কারণপরিসংখ্যান বলছে, সৌরনীলের পরে গত ৩৬ মাসে সেখানে আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেখানে মারা গিয়েছেন পাঁচ জন!

    এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার কলকাতার ওই অংশের পথ নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন করে উদ্যোগী হয়েছে কলকাতা পুলিশ। পথসভা করে সেখানে পথচলতি নাগরিক থেকে অটোচালকদের সচেতনতার পাঠ দিয়েছেন পুলিশ কর্তারা। সেই সঙ্গেই বসেছে একাধিক পথবিধি সংক্রান্ত ট্র্যাফিক সঙ্কেত। তার মধ্যে কোনওটিতে লেখা রয়েছে ধীরে চলার কথা, কোনওটিতে মনে করানো হয়েছে নির্দিষ্ট লেন মেনে গাড়ি চালানোর কথা, জ়েব্রা ক্রসিং দিয়ে পারাপারের নিয়ম। কোনওটিতে আবার ফোনে কথা বলতে বলতে না হাঁটার এবং গাড়িতে সিটবেল্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গেই একাধিক জায়গায় ‘ইউ টার্ন’ নেওয়ার নিয়মে বদল এনেছে পুলিশ। ইএসআই হাসপাতালে প্রবেশ ও প্রস্থানের পথেরও বদল করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রের খবর, জোকার দিক থেকে এখন ইএসআই হাসপাতালে প্রবেশ করতে হবে, বেরোতে হবে ঠাকুরপুকুরের দিকের রাস্তা দিয়ে। জোকার দিকের হাসপাতালের গেটের কাছ থেকে অ্যাম্বুল্যান্স ছাড়া সমস্ত গাড়ির ইউ টার্ন নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল থেকে বেরনো গাড়িগুলিকে ডায়মন্ড হারবার-জেমস লং সরণি মোড় অথবা জোকা ট্রাম ডিপোর কাছ থেকে ‘ইউ টার্ন’ করানো হচ্ছে। এ ছাড়াও পথচারীদের জন্য প্রচুর ‘ড্রপ গেট’ এবং ব্যারিকেড বসিয়েছে পুলিশ।

    কিন্তু স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এমন সব পদক্ষেপ বছর তিনেক আগে সৌরনীলের মৃত্যুর পরেও করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ৪ অগস্ট বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার পথে লরির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যায়বড়িশা হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র সৌরনীল। এর পরে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় ওই এলাকা। মৃতদেহ আটকে রেখে ডায়মন্ড হারবার রোড বন্ধ করে বিক্ষোভ দেখানো হয়। ডায়মন্ড হারবার রোডের ট্র্যাফিক গার্ড ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খায়। ঘটনায় কলকাতার তৎকালীন নগরপাল বিনীত গোয়েলকে সরাসরি ফোন করে একাধিক নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পরেই ওই রাস্তায় একাধিক বুম ব্যারিয়ারবসানো হয়, বসে একাধিক ট্র্যাফিক সিগন্যালও। যদিও অনেকেরই অভিযোগ, দিনে অফিসের ব্যস্ত সময়ে এগুলি থাকলেও দুপুরের পরে এবং রাতে রাস্তায় তেমন পুলিশকর্মী দেখা যায় না। পুলিশের রিপোর্টও বলছে, গত কয়েক দিনের বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে মধ্য রাতে এবংভোরের দিকে। কারণ হিসাবে পুলিশের একাংশের দাবি, রোড কংগ্রেসের নিয়ম মেনে এই পথে হাম্প বসানো যায় না। ফলে রাতে এই রাস্তায় অতি দ্রুত গতিতে গাড়ি ও লরি চলে। সেই সময়ে পর্যাপ্ত নজরদারিওথেকে না। আশপাশের ঘিঞ্জি এলাকা থেকে এই সময়ে ট্র্যাফিক বিধি ভেঙেই অনেকে মূল রাস্তায় উঠে আসেন। এই অংশের ফুটপাতও দখলমুক্ত করা যায়নি। ফলে বহু জায়গাতেই হাঁটার পরিসর নেই।

    এ দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে সচেতনতা প্রচারের কাজ করা কলকাতা পুলিশের যুগ্ম নগরপাল পদমর্যাদার এক আধিকারিক অবশ্য বললেন, ‘‘ডায়মন্ড হারবার রোডে আগের চেয়ে দুর্ঘটনা অনেক কমেছে। সম্প্রতি যে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার বেশির ভাগই হয়েছে বাইকচালকের দোষে। নিয়ম ভেঙে একমুখী পথে উল্টো দিক দিয়ে বাইক চালাতে গিয়েও মৃত্যু হয়েছে। তবে নিরাপত্তা বাড়াতে আরও যা যা করা যায়, সব করা হচ্ছে। রাতের দিকে নজরদারি আরও বাড়ানো হচ্ছে।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)