• আমি হাসপাতালে ঢুকছি, মণিশংকরকে শেষবার দেখতে
    আজকাল | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সুধাংশুশেখর দে

    হাসপাতালে যাচ্ছি। শংকর, মণিশংকরকে শেষবার দেখতে। একে একে মনে ভিড় করে আসছে কত কত কথা। কোথায় শুরু, কতকালের পরিচয়। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাজার কথা। বলতে গেলে যেন ফুরিয়ে যাবে গোটা দিনটাই। লিখতে গেলে ফুরিয়ে যেতে পারে খাতাও। ভেবে দেখলাম, শংকরের সঙ্গে আমার  পরিচয় কবেকার? গুনলে পাঁচ দশকের বেশি হবে। এতদিনের পরিচয়, এত বই, লেখা, সব রেখে পাড়ি দিলেন 'দাদা'। 

    মনে পড়ছে, ১৯৭০ সালের কথা। দে বুক স্টোর, দে বুক স্টল পেরিয়ে, তখন যুক্ত হলাম দে'জ পাবলিশিং প্রকাশনায়। একে একে কাজ করছি, একে একে পরিচয় হচ্ছে লেখকদের সঙ্গে। তার দু' বছর পর, ১৯৭২ নাগাদ আমার সঙ্গে পরিচয় হল মণিশংকর মুখার্জির। ততদিনে সাহিত্য জগতে তিনি পরিচিত নাম। একে একে বই বেরিয়েছে, সেসব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তখন প্রায়ই আসতেন কলেজ স্ট্রিটে। বাবা একদিন আমার পরিচয় করালেন মণিশংকর মুখার্জির সঙ্গে।

    সেই যে তখন থেকে পরিচয়, এই শেষদিনটি পর্যন্ত সেই সুতোয় টান পড়েনি কখনও। অথচ এই মাঝের সময়টকাল তো নেহাত কম নয়। দিন-দুনিয়ায় কত বদল হল, ইয়ত্তা নেই। মনে পড়ছে, তখন তিনি হাওড়ায় থাকতেন। শিবপুর থেকে যাতায়াত করতেন অফিসে, মাঝে মাঝে আসতেন কলেজ স্ট্রিটে। আমারও দিনে দিনে শিবপুরের বাড়িতে যাতায়াত বাড়ল মণিশংকরের সঙ্গে। একদিন একটা বই করার কথাও বলে ফেললাম। বললেন দেবেন। তারপর তো আজ যায়, কাল যায়, পরশু যায়। একদিন এসে বললেন, বই দেবেন। আমি তো মহাখুশি। কবে আসবে বই? কবে? ভাবতে ভাবতেই আমার হাতে এল শংকরের প্রথম বই। 

    ১৯৭২-এ পরিচয়। ১৯৭৬-এ প্রথম বই করলাম আমি শংকরের। দেখলাম, একটি বইয়ের আকারে হলেও, আসলে তিনটি বই মিলিয়ে ওই একটি বই তৈরি করেছেন তিনি। 'জন অরণ্য', 'আশা আকাঙ্ক্ষা', 'সীমাবদ্ধ'। বইটার নাম হয়েছিল 'স্বর্গ মর্ত পাতাল।' আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে বইটা প্রকাশ পেয়েছিল, ২রা আগস্ট, ১৯৭৬। দে'জ পাবলিশিংয়ের জন্যও ওই বই একটা 'ক্লিক' ছিল। কারণ ততদিনে শংকরের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। আমি প্রথম বই প্রকাশ করেছি।

    প্রথম ১৫ দিন। ওই বইয়ের প্রথম ১৫ দিনে যে কী বিপুল সাড়া পড়েছিল, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সংস্করণের পর সংস্করণ প্রকাশ করেছিলাম। লক্ষ কপি প্রকাশ করেছি। বিক্রি হয়েছে হুড়মুড়িয়ে। পাঠকের সেই চাহিদা, প্রকাশক হিসেবে দেখেছি আমি দাঁড়িয়ে। সেই বইয়ের চাহিদা আজও কী বিপুল! তারপর তো, একের পর এক বই প্রকাশ করতে শুরু করলাম। 'চৌরঙ্গি' ছিল অন্য প্রকাশনার, সেটাও আমার প্রকাশনায় চলে আসে। 'এপার বাংলা ওপার বাংলা'ও তাই। এখন ওঁর প্রায় সব বই-ই আমাদের প্রকাশনার।

    আসলে এত দীর্ঘ সময়ের পরিচয়। দে'জ-এর সঙ্গে ওঁর একটা পারিবারিক যোগাযোগ হয়েছিলই। লেখক আর প্রকাশকের পরিবার, কবে যে কাজের বাইরে, অঙ্গাঙ্গিকভাবে আমরা জড়িয়ে গেলাম। আমি ডাকতাম দাদা বলে। আমাকে বলতেন ছোট ভাই। ডাকতেন সুধাংশু বলে। আমার বড় ছেলে অপুকে জন্মাতে দেখেছেন।  শংকরদা'র চাকরির বদল হল। বইয়ের সংখ্যা বাড়ল। কিন্তু কী আশ্চর্যভাবে আমাদের যোগাযোগ ফিকে হয়নি এতটুকু।

    অথচ, আজ কেমন, সব সমীকরণ বদলে দিলেন। একবারও আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন কি? নিজে নিজেই কেমন চলে গেলেন। আমি হাসপাতালে ঢুকছি। শংকর, মণিশংকরকে শেষবার দেখতে।

     
  • Link to this news (আজকাল)