তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’ নিয়ে যখন বাংলার পাঠকমহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে, এক বর্ষীয়ান সাহিত্যিক নাকি মন্তব্য করেছিলেন, “নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। কিন্তু পরে কী লেখে, তা দেখো। মনে হয় না, দীর্ঘ দিন ধোপে টিকবে।” কিন্তু মণিশংকর মুখোপাধ্যায় তথা শংকর নামের সে দিনের তরুণ লেখকটি পার করে ফেলেন অনেকগুলি মাইলফলক। সেই অগ্রজের সন্দিহান মন্তব্যটি ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে যে ফলে যায়নি, তা বাঙালি পাঠক জানেন। শুধুই গ্রন্থসংখ্যার বিচারে নয়, বিমল মিত্রের পরে শংকর নামটি হয়ে দাঁড়ায় ‘বেস্ট সেলার’ এক লেখকের নাম, একের পর এক বই সংস্করণের পর সংস্করণ অতিক্রম করতে থাকে। শংকর হয়ে দাঁড়ান মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবন-অভিজ্ঞতার এক আয়না-মানুষ।
শংকরের জন্ম ১৯৩৩ সালে উত্তর ২৪ পরগণার বনগ্রামে। বনগ্রাম তখন ছিল অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার হাওড়ায় বসবাস শুরু করে। কলকাতার ও পারের এই শহরেই শংকর বেড়ে ওঠেন, খুঁজে পান তাঁর ভবিষ্যৎ সাহিত্যকৃতির বীজ। কৈশোরেই পিতৃহীন হন মণিশংকর এবং জীবিকা অর্জনের পথ খুঁজে নিতে সচেষ্ট হতে হয় তাঁকে। কখনও সেলসম্যান, কখনও বা টাইপরাইটার ক্লিনার, কখনও প্রাইভেট টিউটর হিসেবে কাজ করতে হয় তাঁকে। সেই সঙ্গে চালিয়ে যান প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাও। তবে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায় কলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের করণিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে। বারওয়েল সাহেবের কাছে কাজ করার সময়েই তাঁর সামনে উন্মোচিত হয় কলকাতা হাই কোর্ট, অফিসপাড়া এবং তার অন্তরালবর্তী জীবনপ্রবাহ। এই প্রবাহকেই নিজের লেখার রসদ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন মণিশংকর, পাঠক যাঁকে চিনবেন শংকর নামে।
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘কত অজানারে’। শংকরের প্রথম উপন্যাস। প্রথম থেকেই নিজের নামটিকে খানিক কাটছাঁট করে ‘শংকর’ নামে লিখতে শুরু করেন। ‘কত অজানারে’-র কেন্দ্রে ছিলেন বারওয়েল সাহেব এবং পটভূমিকায় ছিল হাই কোর্ট-সহ শহর কলকাতা। শহরের নিছক কেজো জায়গাটির ভিতরের স্পন্দনকে ধরতে পেরেছিল তাঁর কলম। প্রথম উপন্যাসেই জনপ্রিয়তা পান। এর পর একে একে আসে ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’-র মতো উপন্যাস। শেষোক্ত দুই উপন্যাসকে চলচ্চিত্রায়িত করেন সত্যজিৎ রায়। সমকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালির সার্বিক সঙ্কট থেকে তার মূল্যবোধের অবক্ষয় ছিল এই দুই উপন্যাসের অন্তঃসলিলা উপকরণ। বাঙালি জীবনের উচ্চাশা, তার অনুষঙ্গে আপস এবং তার থেকে জন্মানো মানসিক সঙ্কটকে শংকর ধরতে চেয়েছিলেন তাঁর পরবর্তী উপন্যাসগুলিতেও। ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রায়িত হয় ১৯৬৮ সালে পিনাকীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায়। ছবির পটভূমিকায় ছিল শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এক নামজাদা হোটেল, যাকে ঘিরে মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বপ্নের বুদবুদ। সেই বুদবুদটিই এক ফুঁয়ে ফাটিয়ে তার অন্দরমহলের আলোছায়াকে তুলে ধরে এই উপন্যাস। সিনেমার পর্দায় এই আখ্যানের অন্যতম চরিত্র স্যাটা বোসকে মূর্ত করে তোলেন উত্তমকুমার। পরবর্তী কালে শংকর বার বার সত্যজিৎ রায় এবং উত্তমকুমারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেছিলেন যে, তাঁর লিখনের জনপ্রিয়তাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয় এই দুই কিংবদন্তির স্পর্শ।
বাণিজ্যসফল লেখক শংকরের প্রতি বাঙালি বিবুধ পাঠকের খানিক উন্নাসিক অবহেলা ছিলই। কিন্তু সংস্করণের পর সংস্করণ নিঃশেষিত হওয়ার উদাহরণ কলকাতার বইপাড়ায় এতখানি দৃশ্যমান ছিল না। বাঙালির বিয়েবাড়ির উপহারে একসময় শংকরের বই হয়ে ওঠে ‘মাস্ট’। এই পরিমাণ বিকিকিনির পরেও কিন্তু জনপ্রিয়তম সাহিত্যিকদের একজন শংকর তাঁর লিখনের সঙ্গে আপস করেননি কখনওই। সাবলীল ভাষা, হাতে ছোঁয়া যায় এমন সব চরিত্র ছিল তাঁর সব থেকে বড় আয়ুধ। বাংলার মূলধারার সাহিত্য বলতে যা বোঝায়, তার অন্যতম রূপকার ছিলেন শংকর। উল্লেখ্য, আশির দশকে শংকরের কয়েকটি বড়গল্পকে নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘এক ব্যাগ শংকর’ নামের একটি বই। আর বইটি সত্যিই ছিল একটি স্বচ্ছ ব্যাগের মধ্যে লভ্য। জানা নেই, এর আগে কোনও বাঙালি লেখকের বইয়ের বিপণন এমন ভাবে হয়েছে কি না। সর্বোপরি, এই বিপণনের অন্যতম দিক ছিল গ্রন্থনামে লেখকের নামের প্রত্যক্ষ ব্যবহার। এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সেই সময়ের পাঠকমহলে। ব্যাগে করে বাজারজাত পণ্যে কি না পরিণতি পেল বই! রক্ষণশীলেরা খানিক ‘গেল গেল’ করে উঠলেও সেই বই তত ক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে পাঠকের হাতে হাতে। আরও একটি বিষয়, এত দিন ‘বড়দের লেখক’ হিসেবে তকমাপ্রাপ্ত শংকর এই বইটি লিখেছিলেন কিশোরদের কথাও মাথায় রেখে। এক অর্থে ‘এক ব্যাগ শংকর’ যেন সূত্রপাত করে বসল বাংলা ‘ইয়ং-অ্যাডাল্ট’ সাহিত্যের। ভবিষ্যতে যে পথে হাঁটবেন বুদ্ধদেব গুহ কিংবা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়।
শুধু চলচ্চিত্র নয়, শংকরের লিখন থেকে মঞ্চস্থ হয়েছে ‘চৌরঙ্গী’ বা ‘সম্রাট ও সুন্দরী’র মতো বাণিজ্যসফল নাটকও। কলকাতা শহরের সেই সময়কার থিয়েটারপাড়ায় শংকর রীতিমতো সাড়াজাগানো নাম। সম্ভবত ‘চৌরঙ্গী’ নাটকেই অবতীর্ণ হয় ‘ক্যাবারে’। ‘সম্রাট ও সুন্দরী’র বিজ্ঞাপনের ছবির ঠিক নীচটিতে স্থান পায় এক বৃত্তের মধ্যখানে ইংরেজি বড়হাতের ‘এ’ হরফটি। বাংলা নাটকের সে এক অন্য ‘সুদিন’। থিয়েটারপাড়ায় একের পরে এক হাউসফুল। আর অন্য দিকে এ হেন নাটকের লেখকের নামটিকে ঘিরে ফিসফিস। শংকর একই সঙ্গে হয়ে ওঠেন নন্দিত ও নিন্দিত। এই আবছায়াই যে তাঁকে আরও বেশি পাঠকের সামনে নিয়ে আসে, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না।
আবার পরবর্তী কালে এই শংকরই লেখেন ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’। একাধারে স্মৃতিকথা ও শ্রদ্ধালেখ্যর সংকলন এই বইও বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। একটা সময়ের পরে শংকর আকৃষ্ট হন শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনের প্রতি। একাধিক বই লেখেন রামকৃষ্ণদেব ও স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে। সেগুলির জনপ্রিয়তাও কম নয়। একদা নিন্দা-সমালোচনার ফল্গুস্রোতের বাইরে এক অন্য রকম শ্রদ্ধা আদায় করে নেয় ‘শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ রহস্যামৃত’ বা ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’-এর মতো গ্রন্থগুলি। পাশাপাশি এই শংকরই লিখেছেন বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে। কল্প-আখ্যানের চৌহদ্দি পেরিয়ে কখন যে তিনি সরস ‘নন ফিকশন’-এর লেখক হয়ে উঠেছেন এবং সেই বৃত্তেও তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট থেকেছে, তা টের পায়নি বাংলার আম পাঠককুল। শংকর জনপ্রিয় ধারার ক্রাইম ফিকশন বা রহস্যোপন্যাস লেখেননি। রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারও না। কিন্তু পাঠক তাঁকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়েছে। পাড়ার লাইব্রেরিতে শীর্ষে থেকেছে তাঁর বইয়ের চাহিদা। ‘লেখক=ইন্টেলেকচুয়াল’ এই সমীকরণটির বিরোধিতা করেও যে নিজেকে লিখনের প্রতি দায়বদ্ধ রাখা যায়, এমন উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই। শংকর সেই বিরলদের মধ্যে একজন হয়েই থাকবেন। ‘মরুভূমি’, ‘একদিন হঠাৎ’ কিংবা ‘ঘরের মধ্যে ঘর’-এর লেখক যে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে রামকৃষ্ণ-কেন্দ্রিক সাহিত্যে নিজের আসনটি পাকা করে নেবেন, এমন উদাহরণও সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় ছাড়া তিনিই।
কর্মজীবনে বাংলার অন্যতম প্রধান বণিকগোষ্ঠীর জনসংযোগের দায়িত্ব সামলেছেন। পরবর্তী কালে কর্পোরেট জগতে তিনি এক বিশিষ্ট নাম হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই সব কিছু সামলিয়েও লিখে গিয়েছেন নিরন্তর। ১৯৯৩ সালে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার, ২০২১ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ২০২২-এ এবিপি আনন্দ তাঁকে ‘সেরার সেরা বাঙালি’ সম্মান প্রদান করে।
শংকরের সাহিত্যকৃতিকে আজ আর পাশে সরিয়ে রাখার উপায় নেই বাঙালির। কারণ, তা ‘সাহিত্য’-সীমানা পেরিয়ে অজান্তেই হয়ে দাঁড়িয়েছে এক দীর্ঘ সময়ের (কিংবা বলা ভাল, অসময়ের) বঙ্গজীবনের দলিল। জীবিকার্জনের সোজা-বাঁকা রাস্তা, কাঁটা-কুসুমে আকীর্ণ জীবনরেখা পার করে তাঁর কলম আশ্রয় করেছিল এক আধ্যাত্ম ও শান্তির পরিমণ্ডলকে। বাঙালির গার্হস্থ্য থেকে বানপ্রস্থকে তিনি লিখে রেখে গেলেন। কখনও যদি ইতিহাস খোঁজ করে সে দীর্ঘ যাত্রারেখার, তা হলে তাঁর লিখনই হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের অন্যতম উপাদান। লেখকজীবনের সাফল্য সম্ভবত সেখানেই নিহিত। বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছিলেন নবতিপর লেখক। এই মুহূর্তে তাঁর শূন্যতাকে ভরাট করতে পারে, এমন সব্যসাচী কি বাঙালি লেখককুলে আছেন? সম্ভবত নয়। কারণ, শংকর ছিলেন এক বিশেষ সময়ের ফসল অথবা সময়ই দাবি করেছিল ‘শংকর’ নামক এক মসীজীবীকে, যিনি ধরে রাখতে পারেন তামস থেকে বৈরাগ্যকে, যন্ত্রণা থেকে উত্তরণকে, দুঃসময়ের মধ্যে নিহিত থাকা আলোকরেখাকে।