নামফলকে বাংলা অক্ষর কি শুধুই ঘোষণা, প্রশ্নে পুরসভার সদিচ্ছা
আনন্দবাজার | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং, দোকানের নামফলক, এমনকি, রাস্তার সাইনবোর্ড বা সরকারি দফতরের নামফলক— সব ক্ষেত্রেই অন্য ভাষার পাশাপাশি বাধ্যতামূলক ভাবে লিখতে হবে বাংলাতেও। ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর কলকাতা পুরসভার মাসিক অধিবেশনে এই মর্মে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ওই বছরের ১২ নভেম্বর পুরসচিবের তরফে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়, শহরের সমস্ত বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং, দোকানের নামফলকে বাংলা না লিখলে পুরসভা কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু প্রায় দেড় বছরেও বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং বা দোকানের নামফলকে বাংলা অক্ষর অধরাই রয়ে গিয়েছে। ফলে, প্রশ্নের মুখে কলকাতা পুরসভার সদিচ্ছা।
বৃহস্পতিবার এ নিয়ে একটি বেসরকারি সংস্থার তরফে পুর সচিবের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। সর্বত্র বাংলা লেখা কার্যকর করতে বাংলা ভাষাপ্রেমী ওই সংস্থার প্রতিনিধিরা পুর সচিবের সঙ্গেদীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন। শহরে বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং বা দোকানের নামফলক বাংলায় লেখা যে সর্বত্র কার্যকর হয়নি, তা স্বীকার করে নেন কলকাতা পুরসভার কমিশনার সুমিত গুপ্ত। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘‘শহরের অনেক দোকানের ফলকে বাংলায় নাম লেখা হয়েছে। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। পুরসভার তরফে বরোভিত্তিক টিম করে অভিযান চালানো হবে। নামফলকে অন্য ভাষার পাশাপাশি অবশ্যই বাংলায় লিখতে আমরা নোটিস দেব।’’
প্রসঙ্গত, নামফলকে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক করতে পুরসভার তরফে একাধিক বার লালবাজারে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এক পুর আধিকারিক বলেন, ‘‘পুরসভার তরফে কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং লালবাজারের তরফে প্রতিটি থানায় ওই বিজ্ঞপ্তি গিয়েছে। কথা ছিল, থানার ওসি-রা তাঁদের এলাকার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামফলকে অন্য ভাষার পাশাপাশি যেন বাংলায় নাম লেখার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি।’’
২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর পুরসভার মাসিক অধিবেশনে ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি বিশ্বরূপ দে তাঁর প্রস্তাবে জানান, বাংলা ভাষা ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে। কলকাতা পুরসভার উচিত, তাদের অধীনে সরকারি, বেসরকারি স্তরে যাবতীয় সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া। পাশাপাশি, পুরসভার নথি-সহ সব চিঠিপত্র, বিজ্ঞপ্তিও বাংলায় প্রকাশ করা প্রয়োজন। প্রস্তাবে মেয়র সম্মতি দেন। তার পরেই ওই নীতি কার্যকর করতে পুর সচিবের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল।
২০২৪-এর ১২ নভেম্বরের সেই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শহরের সমস্ত দোকান, রেস্তরাঁর নামফলকে বাংলা লেখা নিশ্চিত করতে পুরসভার বিজ্ঞাপন ও লাইসেন্স দফতর ওই সমস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। পুরসভার তৎকালীন চিফ ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) এবং চিফ ম্যানেজার (লাইসেন্স)-কে নির্দেশিকাও পাঠানো হয়েছিল। তবু কেন বিজ্ঞপ্তি কার্যকর হল না?
পুরসভার মেয়র পারিষদ (বিজ্ঞাপন) দেবাশিস কুমার বলেন, ‘‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’’ এক পুর আধিকারিকের কথায়, ‘‘অতীতে বাম আমলে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য মেয়র থাকাকালীন শহরের দোকান, রেস্তরাঁর নামফলকে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবে রূপ পায়নি। অতীতের পুনরাবৃত্তিই হচ্ছে।’’
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এটা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে প্রথম আন্দোলন শুরু করেছিলেন।’’ তাঁরও প্রশ্ন, ‘‘পুরসভা এক বছরের বেশি আগে ঘোষণা করলেও বাংলায় নামফলকের উদ্যোগ কেন বাস্তবায়িত হল না? এটা তো পুরসভার সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। নামফলকে ইংরেজি বা হিন্দিতে লেখা থাকুক, কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু বাংলায় লেখা অবশ্যই থাকতে হবে।’’
১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা-প্রধান থাকাকালীন পুলিশের বিভিন্ন দফতর, কার্যালয়ে বাংলায় লেখা চালু করেছিলেন আইপিএস নজরুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে নজরুলের পর্যবেক্ষণ, ‘‘কলকাতা পুরসভা দোকানের নামফলকে বাংলায় লেখা আবশ্যিক করতে কোনও আইন করেছে কি? কোনও ব্যবসায়ী বাংলা না লিখলে, সেই নামফলক সরিয়ে ফেলতে আইন করতে হবে। নয়তো শুধু বিজ্ঞপ্তি জারি করে, চিঠি পাঠিয়ে কাজ হবে না।’’