• বিলুপ্তির পথে ভাষা শহিদের স্মৃতি, আগাছায় ঢেকেছে বাড়ি
    এই সময় | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • প্রদীপ চক্রবর্তী, কোন্নগর

    জিটি রোড ধরে হুগলির কোন্নগর থেকে উত্তরপাড়ার দিকে যাওয়ার পথে চোখে পড়বে একটা পুরোনো জরাজীর্ণ বাড়ি। বাইরে ভগ্ন ইটের প্রাচীর। বাড়ির দেওয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। ছাদের ইট পর্যন্ত বেরিয়ে পড়েছে। বাগানে ডালপালা বিস্তার করেছে বাঁশঝাড়। পাশেই রয়েছে দু’টি পুকুর। তাতে আগাছা জন্মেছে। অথচ, এই বাড়িটি এক সময় মানুষের ভিড়ে গমগম করত।

    ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের অমর শহিদ সফিউর রহমান। সেই ঐতিহাসিক বাড়ি অবহেলা ও অনাদরে এখন ধ্বংস হতে বসেছে। ইতিহাসবিদরা জানাচ্ছেন, কোন্নগরের এই বাড়িতেই যৌবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন সফিউর রহমান। তাঁদের পূর্বপুরুষরা মোগল দরবারে হেকিমের কাজ করতেন। তারই পুরস্কার হিসেবে মোগলরা পরিবারটিকে ২০৯৮ বিঘা জমি দান করেছিল।

    সেই সূত্রে সফিউরের পূর্বপুরুষ হেকিম আশাদুর রহমান পরিবার নিয়ে কোন্নগরে বসবাস শুরু করেন। বাড়ির নাম রাখা হয়, ‘হেকিম সাহেবের বাড়ি।’ ১৯৩৬ সালে কোন্নগর হাইস্কুল থেকে পাশ করার পরে সফিউর কলকাতার প্রেসিডেন্সি এবং​ পরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন।

    পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সফিউর ছিলেন বড়। শান্ত স্বভাবের সফিউরকে অনেকে ‘লালু’ বলে ডাকতেন। বাবা মহবুবা রহমান ছিলেন আদালতের জুরি। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে তিনি চলে যান পূর্ব পাকিস্তানে (অধুনা বাংলাদেশ)। পরবর্তীকালে তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহিদের মৃত্যুবরণ করেন সফিউর।

    পরিবারের লোকেদের আক্ষেপ, প্রতি বছর ভাষা দিবসে কোন্নগর শহরে সফিউরকে শ্রদ্ধা জানানো হলেও, তাঁর জন্মভিটে রক্ষার ব্যাপারে কেউ এখনও পর্যন্ত এগিয়ে আসেননি।

    সফিউরের খুড়তুতো ভাই আহাসানুর রহমান বলেন, ‘শরিকি ঝামেলা থাকলেও আমরা ভাষা শহিদের জন্মভিটেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছি। বাড়ি দখলের জন্য প্রোমোটার চক্র অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যদি সরকারি অনুদান পাই, তা হলে বাড়িটা সংস্কার করে রক্ষণাবেক্ষণ করব। বাড়িটা আমরা কোনও ভাবেই বিক্রি করব না।’ তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, কোন্নগর পুরসভার উদ্যোগে কোন্নগর হাইস্কুলের সামনে জিটি রোডের উপরে একটি স্মৃতিফলক বসানো হয়েছে কয়েক বছর আগে।

    কোন্নগরের পুরপ্রধান স্বপন দাস বলেন, ‘ভাষা শহিদের বাড়ি নিয়ে শরিকি দ্বন্দ্ব রয়েছে। তবুও, ওঁরা যদি আমাদের কাছে বাড়ি সংস্কারের আবেদন করেন, তা হলে পুরসভা সেটা বিবেচনা করবে।’ ইতিহাসবিদ অনুপম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে এই রাজ্যের নাড়ির যোগ রয়েছে। এখন আরও বেশি করে সময় এসেছে সফিউর রহমানকে নতুন করে স্মরণ করার। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর লড়াই, তাঁর অবদানের কথা ছড়িয়ে দেওয়ার। আমি গর্বিত, এমন একজন মানুষ আমাদের রাজ্যে ছিলেন। আমি চাই, বাড়িটি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুক সরকার।’

  • Link to this news (এই সময়)