প্রবীর চক্রবর্তী: শনিবার, ভাষাদিবসের দিন রাজনৈতিক মহলে সবথেকে আলোচিত বিষয় বাম শিবিরের প্রাক্তন তরুণ তুর্কি প্রতীক উর রহমানের ভোলবদল বা প্রতীক বদল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আবহে 'সিপিআইএম' সংশ্রব ত্যাগ করে ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছেন প্রাক্তন এসএফআই নেতা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংসদ কার্যালয়ে এই আনুষ্ঠানিক দলবদল হচ্ছে। শনিবারের বিকেল ৪.১০ মিনিট নাগাদ, রক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে দঃ ২৪ পরগণার ডায়মন্ডহারবারের আমতলার তৃণমূলের পার্টি অফিসে আসেন। এরপর, আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলের পতাকা তুলে নেন ২০২৪-এ খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সামনে দাড়িয়ে লড়াই-এর মুখ প্রতীক উর।
সাদা শার্ট, গালে চাপদাড়ি, পাশে নেতা অভিষেককে সঙ্গে নিয়েই তাঁর দলবদল রাজ্য রাজনীতির সবথেকে আলোচিত মুখ। হাতে মাইক নিয়ে অভিষেক পাশে দাড়িয়ে চাঁচাছোলা ভাষায় সিপিএমের উত্তুঙ্গ সমালোচনা করেন। তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন প্রতীক উর কোনও চাওয়া পাওয়া নিয়ে ভাবিত নন। প্রতীক দলে এসেছেন সংগঠনের কাজ করতে। স্নো পাউডার মেখে টিভি চ্যানেলে মুখ দেখানো সিপিএমের নেতাদের কথা মনে করিয়ে দেন। বামপন্থী দল ছেড়ে ঋতব্রত, কানহাইয়া কুমার কেন অন্য দলে গেলেন এই প্রশ্ন করেন। সিপিআইএম ভোট কেন বিজেপিতে শিফ্ট হল? কেন রাতের অন্ধকারে এমন দলের সঙ্গে সিপিএমকে আলোচনায় বসতে চায়, যারা দাঙ্গা বাঁধাতে হয়-এই প্রশ্ন করেন?
অনেক নতুন মুখকে তৃণমূল সুযোগ দিয়েছে। দেবাংশু থেকে সায়নী ঘোষ, এমনকি ২৬ বছর বয়সে প্রথম পার্লামেন্টে গিয়েছিলেন খোদ অভিষেক- তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের ১৫০০ টাকায় জানি কিছু হয় না, কিন্তু ভবিষ্যতে বা অন্য দলের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে। প্রতীক উর বলেন, BJPকে ঢুকতে দেবো না- তৃণমূল এর সঙ্গে এই ডিল হয়েছে। মার খেয়েছিলাম সিপিএম এর জন্য, কিন্তু তারা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। রাজা তোর কাপড় কোথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাই আমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সৃজন-দীপ্সিতা জয়েন করবে কি না জানি না।
কেন শুন্য পাওয়া দল থেকে লোক নিতে হল, অভিষেককে জিগ্যেস করা হলে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, 'কারা জিগ্যেস করছে, তাদের সামলে আসতে বলুন। সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে সামনে আসতে বলুন, তাতে বিরোধিদের সিট বাড়বে বই কমবে না। তিনি নিজেও খুব খুশি প্রতীকুর তৃণমূলে যোগদান করায়।
বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ও সিপিএমের অস্বস্তি
গত কয়েকদিন ধরেই সিপিএমের অভ্যন্তরীণ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে ফাঁস হওয়া একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে জলঘোলা শুরু হয়েছিল। দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে রাজ্য কমিটি তথা দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন প্রতীক। তাঁর অভিযোগ ছিল, বর্তমানে সিপিএমে ‘কর্পোরেট সংস্কৃতি’ চলছে এবং প্রশ্ন করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি মহম্মদ সেলিমকে ‘সিপিএমের গব্বর সিং’ বলেও কটাক্ষ করেন।
প্রতীক-উরের এই বিদ্রোহে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট রীতিমতো অস্বস্তিতে। যদিও দলের পক্ষ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করার বদলে ‘ধরে রাখার’ কৌশল নেওয়া হয়েছিল। প্রবীণ নেতা বিমান বসুও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু প্রতীক নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। শুক্রবার সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে জানান, প্রতীকের মতো একজন কর্মীকে হারানো তাঁর কাছে ‘সন্তান হারানোর শোকের’ সমতুল্য। তবে তিনি এও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তৃণমূল বা বিজেপি ল্যান্ডমাইন বসিয়েও সিপিএমকে শেষ করতে পারবে না।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও মমতার প্রশংসা
তৃণমূলে যোগ দেওয়ার আগেই প্রতীকের কণ্ঠে শোনা গেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা। বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার একটি ভিক্ষা’—এই তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দিয়ে প্রতীক জানিয়েছেন, এই প্রকল্প রাজ্যের সাধারণ মা-বোনেদের আত্মসম্মান বাড়িয়েছে। তিনি মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের উন্নয়নে সঠিক দিশা দেখিয়েছেন। এমনকি অতীতে তাঁর ওপর হওয়া শারীরিক আক্রমণের দায়ও তিনি বর্তমান তৃণমূলের ওপর চাপাতে নারাজ। তাঁর দাবি, যাঁরা তাঁকে মেরেছিলেন তাঁরা এখন বিজেপিতে রয়েছেন; মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানলে হয়তো এমনটা হতো না।
রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
প্রতীক-উরের এই দলবদল নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ই প্রতীক ও তৃণমূলের মধ্যে চুক্তি হয়ে গিয়েছিল। তিনি প্রতীককে ‘বিড়াল’ বলে সম্বোধন করে তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে, প্রতীক-উর রহমান নিজে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানিয়েছেন, "আমি যখন এসএফআই বা সিপিএম করেছি, বুক ঠুকে করেছি। এখন যে দল করব সেটাও বুক ঠুকেই করব।" তিনি নিজেকে একজন যোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করতে চান এবং মনে করেন বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ে তৃণমূলই একমাত্র শক্তিশালী মঞ্চ।
সাংগঠনিক প্রভাব
প্রতীক উর একা নন, তাঁর সঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক এরিয়া কমিটির সম্পাদক, সদস্য এবং জেলা কমিটির অনেক সদস্য তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন বলে জল্পনা ছড়িয়েছে। যদি এমনটা হয়, তবে লোকসভা নির্বাচনের আগে ডায়মন্ড হারবার সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় সিপিএমের সাংগঠনিক কাঠামো বড়সড় ধাক্কা খাবে।
তৃণমূল সূত্রে খবর, আজ শনিবার আমতলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতেই এই মেগা যোগদান সম্পন্ন হবে। যদিও অভিষেকের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে তিনি ‘দলের অভ্যন্তরীণ বৈঠক’ করতে সেখানে যাচ্ছেন, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকের হাতে তৃণমূলের ঝাণ্ডা তুলে দেওয়ার মুহূর্তটিই হতে চলেছে আজকের দিনের সবথেকে বড় চমক।
প্রতীক উর রহমানের এই সিদ্ধান্ত বাম শিবিরের জন্য যেমন রক্তক্ষরণ, তেমনি তৃণমূলের জন্য এক বড় জয়। যে তরুণ নেতাকে সামনে রেখে বামেরা নতুন আশার আলো দেখেছিল, তাঁর এই ‘বিদ্রোহ’ এবং ‘ঘরবদল’ আগামী দিনে বাংলার ছাত্র-যুব রাজনীতিতে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।