• প্রাণোচ্ছল এক মানুষের হাতে তৈরি জীবন্ত দলিল, উচ্চকোটির নিম্নগামিতা
    এই সময় | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • তিলোত্তমা মজুমদার

    একজন বিদগ্ধ সাহিত্যিকের প্রয়াণ এমন অন্ধকার শূন্যতা তৈরি করে, যার পরিপূরণ হয় না। শংকর তাঁর অগণিত গুণমুগ্ধ পাঠক, বন্ধু, অনুগামীদের সেই শূন্যতায় রেখে চিরবিদায় নিলেন।

    তাঁর পরমায়ু ৯২ বছর, কিন্তু তা ওই হিসেবমাত্র ছিল, বার্ধক্যের মানসিক জড়তা তাঁকে বিকল করেনি। এই সে দিনও তিনি একজন যুবকের মতোই প্রাণোচ্ছল, অনুষ্ঠানে-আড্ডায় রসরসিক। অফুরন্ত গল্পের ভাণ্ডার থেকে টুকরোটাকরা বার করছেন। হেসে উঠছেন, হাসিয়ে তুলছেন, তাঁকে ঘিরে যাঁরা বসে আছেন, তাঁদেরও।

    বাংলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক জনসমক্ষে এক রকম নির্মোক সাজিয়ে তুলতে ভালবাসেন। সে সব অন্যায় বা নিন্দনীয় নয়। তবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করেও শংকরের মধ্যে বেশবাস বা গোঁফদাড়ির চিত্তাকর্ষক সাজসজ্জার প্রতি আগ্রহ দেখা যায়নি। তার জন্য তিনি কিছু কম সাহিত্যিক হয়ে ওঠেননি, স্বীকৃতি ও সম্মানপ্রাপ্তির ঘাটতিও তাঁর জীবনে দেখা যায়নি। তিনি একজন আত্মস্থ, সরস, কর্মদক্ষ ব্যক্তি, যাঁর গল্প বলার ক্ষমতা চমৎকার এবং যাঁর ছিল তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মানসচক্ষু।

    ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শংকরের প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’ বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য সংযোজন। সেই উপন্যাসের বিষয় তিনি কী করে সংগ্রহ করেছিলেন, সে কথা সকলেরই জানা। কলকাতা উচ্চ ন্যায়ালয়ের শেষ ব্রিটিশ আইনজীবীর সান্নিধ্য ও ন্যায়ের জগতের প্রতিটি ইট-পাথরে নিহিত অন্যায়, বঞ্চনা, শোষণ ও অপরাধের দলিল তিনি পাঠ করেছিলেন একজন মনোযোগী, মেধাবী গবেষক-ছাত্রের মতো। এই উপন্যাস ডাকটিকিটের মতো চিরকালীন। যে অজানাকে উনি জানিয়ে দিতে চেয়েছেন, ব্যক্তিগত উপস্থিতি আড়াল না করেও, নিরাসক্তি ও অবিচল চিত্তে ছোট ছোট কাহিনি বলার মতো, যা থেকে অনেকেই মনে করেন ‘কত অজানারে’ তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস, তা আজও ধারণ করে আছে, খলনায়কের মতো কোর্ট চত্বরের দুর্নীতি ও লোকঠকিয়ে দু’পয়সা আয় করার লালাসিক্ত লোভ।

    শংকরের ভাষা সহজ, গতিময়। তাঁর বলা যেন বহু কালের পরিচিত কোনও ব্যক্তির কথন। ‘কত অজানারে’ একেবারে শুরু থেকেই বাংলার পাঠকমানস আকর্ষণ করেছিল। শুধু ভাষাই তার কারণ নয়। গোড়াতেই চৌরঙ্গিপাড়ার এমন এক জগতের কাছে পাঠককে তিনি নিয়ে গেলেন, যা অজানা, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত, যা গেরস্তের কাছে ভীতিপ্রদ। ন্যায়ালয়কেন্দ্রিক যাপনের প্রতি এই আতঙ্ক অমূলক নয়। এক জায়গায় বারওয়েল বলছেন, ‘আমরা যারা আইনের কারবার করি, তারা মানুষের শুধু বাইরের খোলসটাই দেখি, ভেতরের হাহাকারটা দেখার সময় আমাদের নেই। অথচ এই আদালতের বারান্দায় কত মানুষের কত অজানা ইতিহাস প্রতিদিন ধুলোয় লুটিয়ে পড়ছে তার খবর কে রাখে?’

    বারওয়েলের মধ্যে দিয়ে বিবেকবোধের পরিচয় দিয়েছেন শংকর। ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব, অপরাধ ও অনপরাধের মধ্যেকার অতি সরু ও প্রায় দুর্বোধ্য পার্থক্য, সওয়াল জবাব, সত্য বা সাজানো সাক্ষ্য, আসল বা নকল তথ্যপ্রমাণ, ন্যায় পাইয়ে দেওয়ার মরীচিকা দেখিয়ে এক-একটি জীবন ধ্বংস করে দেওয়া ইত্যাদির অপরাধবোধ, যা মনুষ্যত্বের পক্ষে শুভ, অতিবাস্তব ও প্রত্যক্ষ দর্শনের অভিঘাত-সমেত তিনি উপস্থাপিত করেছেন পাঠকের কাছে। বারওয়েলের আরও একটি দর্শন এখানে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ‘এই জাস্টিস বা বিচার জিনিসটা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় প্রহসন। মানুষ এখানে আসে ন্যায়বিচার পেতে, আর আমরা তাকে দিই কেবল আইন। আমরা আইনের কারিগর, সত্যের পূজারী নই। তুমি যদি মানুষের হৃদয়ের খবর রাখতে চাও, তবে এই কালো কোটটা খুলে রেখে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেও। দেখবে, আদালতের ফাইলের চেয়ে মানুষের চোখের জল অনেক বেশি সত্যি কথা বলে।’

    চৌরঙ্গিপাড়ার অভিজ্ঞতা লেখক শংকরকে বিষয়ঋদ্ধ করেছিল। উচ্চবিত্ত ও ধনী, রিপুরঞ্জিত ও অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার দাসত্বগর্বী মানুষের জগৎ তিনি চিনিয়েছিলেন ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসে। ‘কত অজানারে’ যেমন কোর্ট চত্বরের জীবন্ত দলিল, তেমনই ‘চৌরঙ্গী’ বলে এক যুগসন্ধির ভাষ্য। সমাজের উচ্চকোটির নিম্নগামিতা।

    বাস্তবতার নির্ভেজাল বর্ণনে শংকরের অনেকগুলি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়নের বিষয় হয়েছে। সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেছেন ‘জন অরণ্য’ ও ‘সীমাবদ্ধ’। মধ্যবিত্তের নৈতিক বিচ্যুতি ও অসহায়তা, বেকারত্বর হতাশা ও অন্তর্দহন আজও একই সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে।

    কর্পোরেট দুনিয়াকে একেবারে ভিতর থেকে দেখেছিলেন শংকর। বারওয়েলের সহকারী হিসেবে দেখা যে চৌরঙ্গির বেওসাদারি, সেই সময়ে অসংগঠিত কর্পোরেট, পরবর্তী জীবনে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল আধুনিক, চৌখস, হিসেবি কর্পোরেট জগতে। সেই ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা সাহিত্যে দিয়েছে অন্যতর সম্পদ। কিন্তু নিজের ভিতর সেই হিসেবি জগতের ছায়া তিনি গাঢ় হতে দেননি। তাঁর হাস্যময়, মিশুকে, সহজ ব্যক্তিত্ব তিনি হারিয়ে ফেলেননি। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর গবেষক অনুসন্ধিৎসায় বিস্তর কাজ করে গিয়েছেন। দেহ যায়। যেতে হয়। কিন্তু সৃষ্টির পরমায়ু অননুমেয়, অপরিমিত।
  • Link to this news (এই সময়)