চৌধুরীবাগান-চৌরঙ্গী, ভিত্তি হাওড়াই - শংকরকে বোঝার জন্য তাঁর সাহিত্য নয়, তাঁর হাওড়ার দিনগুলোর দিকেও ফিরে তাকতে হবে
এই সময় | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মলয় লাহিড়ী
শুধু শৈশবই নয়, স্কুলবেলাও। এমনকী, পেশাদার জীবনের শুরুটাও মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের ছিল গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের শহর হাওড়াতেই। চৌধুরীবাগান, কাসুন্দিয়া আর খুরুট— নাবালক মণিশংকর থেকে সাবালক শংকর হয়ে ওঠার অন্যতম ভরকেন্দ্র ছিল মধ্য হাওড়ার এই সব পাড়া, সেখানকার মানুষজন আর সেই সময়ের মধ্যবিত্ত জীবনচর্যা। পরবর্তী সময়ে তিনি যখন বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন, তখনও তাঁর লেখার ভিত জুড়ে থাকে এই হাওড়ার অভিজ্ঞতা। তাই শংকরকে বোঝার জন্য তাঁর সাহিত্য নয়, তাঁর হাওড়ার দিনগুলোর দিকেও ফিরে তাকতে হবে।
১৯৩৩–এ জন্ম মণিশংকরের। আর শৈশবেই সপরিবারে তাঁরা চলে আসেন নেতাজি সুভাষ রোড লাগোয়া হাওড়ার চৌধুরীবাগান এলাকায়। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ১৯৪০-এর দশকের অস্থির সময়ে— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগের উত্তেজনা ও যন্ত্রণা এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থসামাজিক চাপে ভরা সেই যুগ তিনি খুব কাছ থেকে অনুভব করেছিলেন। পাড়ার মানুষ, সরু গলি, জীবনসংগ্রামের নানা ছবি তাঁর চোখে ধরা পড়ে তখনই, যা পরে তাঁর লেখায় বাস্তবতার শক্ত ভিত তৈরি করে। যুবক মণিশংকর এই তল্লাট থেকেই হাইকোর্টের ব্যারিস্টার বারওয়েল সাহেবের কাছে চাকরি করতে যেতেন শংকর হয়ে ওঠার আগে।
প্রথমে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন হাওড়া জেলা স্কুলে। কিন্তু ফি দিতে না পেরে সে স্কুল ছাড়তে হয়। ১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি ভর্তি হন স্বামীজির আদর্শে তৈরি ঐতিহ্যবাহী বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে। এবং ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এই স্কুলের সঙ্গে। প্রথমে এই স্কুল ছিল হাওড়ার খুরুট অঞ্চলে। পরে পাকাপাকি ভাবে স্কুলবাড়ি স্থানান্তরিত হয় কাসুন্দিয়া শিবতলা অঞ্চলে। এই স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষের পরে কলেজ জীবন। তার পর ফের শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসা বিবেকানন্দ স্কুলে।
ওই স্কুলের শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আর একজন ছিলেন— সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্য। শিক্ষাজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন স্কুলের সেই কিংবদন্তি প্রধান শিক্ষক। কঠোর শাসনের পাশাপাশি ছাত্রদের প্রতি তাঁর গভীর স্নেহ ও মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষা তরুণ শংকরের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই , ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায় তাঁর চাকরি জীবনের শুরুই হয় এই স্কুলে শিক্ষকতা করে। সুধাংশুবাবুর ডাক তিনি ফেলতে পারেননি। যে বেঞ্চে একসময়ে ছাত্র হিসেবে বসেছিলেন, সেখানেই পরে শিক্ষকের আসনে দাঁড়ানো— এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। যদিও সেই স্কুলে কিছু দিনই কাজ করেছিলেন তিনি।
চৌধুরীবাগানের সাধারণ পরিবেশ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা মিলিয়েই গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের সাহিত্যিক শংকর। তাঁর লেখায় বাস্তব জীবনের ছোট ছোট ঘটনা, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং সমাজের বহুবর্ণ চিত্র ধরা পড়ে বারবার। চৌধুরীবাগান থেকে চৌরঙ্গী— তাই কেবল দুটো জায়গা বা তাদের দূরত্ব নয়, বরং হাওড়ার মাটি থেকে উঠে আসা এক সাহিত্যিকের আত্মপ্রকাশ, সংগ্রাম ও সৃজনযাত্রার গল্প।