• মিষ্টি জলের ছোঁয়ায় ‘নবজীবন’ সুন্দরবনে, গঙ্গার জল সরাসরি পৌঁছবে বাদাবনে
    এই সময় | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • তাপস প্রামাণিক

    কথিত আছে, কপিল মুনির অভিশাপে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া সাগর রাজার সন্তানদের প্রাণ ফেরাতে মহাদেবকে তুষ্ট করে গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নামিয়ে এনেছিলেন ভাগীরথ। এ বার সুন্দরবনকে বাঁচাতে স্রোতস্বিনী গঙ্গার অবলুপ্তপ্রায় গতিপথকে পুনরুদ্ধার করতে চাইছে রাজ্য সরকার।

    সেচ দপ্তরের রিপোর্ট বলছে, যতদিন যাচ্ছে সুন্দরবনের নদ–নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। বিপন্ন হচ্ছে বাদাবনের পরিবেশ। কমছে ম্যানগ্রোভ। বাড়ছে নদী ভাঙন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাষবাস। নদীতে মাছের উৎপাদনও কমছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সুন্দরবনের পরিবেশ যে ভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে র‍য়্যাল বেঙ্গল টাইগারদের পক্ষেও টিকে থাকা মুশকিল হবে।

    বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের কুমির। সেই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে সুন্দরবনের নদ–নদীতে মিষ্টি জলের জোগান বাড়াতে একটি বড় প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে রাজ্য সরকার। তার জন্য খরচ হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এর জন্য এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেবে রাজ্য। এই প্রকল্পের 'ফিজি়বিলিটি স্টাডি রিপোর্ট' এবং 'ডিটেলড প্রোজেক্ট রিপোর্ট' বানানোর জন্য সম্প্রতি টেন্ডার ডেকেছে রাজ্য সেচ দপ্তর।

    রাজ্যের সেচমন্ত্রী মানস ভুঁইয়া বলেন, 'মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সুন্দরবনে মিষ্টি জলের জোগান বাড়াতে খুব শিগগির নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। তাতে সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং মানুষের জীবন–জীবিকাও রক্ষা পাবে।'

    সেচ দপ্তরের ইঞ্জিনিয়াররা জানাচ্ছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রে জলস্ফীতি ঘটছে। ফলে সুন্দরবনের নদ–নদীতে বেশি পরিমাণ সমুদ্রের নোনা জল ঢুকছে। গঙ্গার গতিপথ বদলে যাওয়ায় বিদ্যাধরী, রায়মঙ্গল, মাতলা, মুড়িগঙ্গা–সহ সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীতে মিষ্টি জলের জোগান কমেছে।

    এই অবস্থায় বাদাবনকে বাঁচাতে 'সুন্দরবন আপার ডেল্টা ক্লাইমেট রিসাইলেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট' নামে একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেচ দপ্তর। তার অন্যতম লক্ষ্য হলো, নদীর জলে লবণাক্ততার পরিমাণ কমানো, স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে তোলা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পুকুর ও জলাশয়ের পুনরুজ্জীবন, আদিগঙ্গা ও পিয়ালির মতো ছোট নদী ও খাল সংস্কার করে নৌকো ও লঞ্চ চলাচলের উপযোগী করে তোলা। উত্তর ২৪ পরগনায় অনেক ভেড়ি ও বিল রয়েছে। তারাও সুন্দরবনকে মিষ্টি জলের জোগান দেয়। সেগুলিকেও পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

    ইসিএসএফ (এসচুয়ারিন অ্যান্ড কোস্টাল ফাউন্ডেশন)–এর অধিকর্তা সৌরভ পাল পাল জানান, বিশ্বব্যাঙ্কের সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর জলে সর্বোচ্চ ২৭ পিপিটি (পার্টস পার ট্রিলিয়ন) এবং সর্বনিম্ন ১৩ পিপিটি পর্যন্ত স্যালিনিটি (লবণাক্ততা) পাওয়া গিয়েছে। ২০৫০ সালে সেটা বেড়ে হবে ৩১–৩২ পিপিটি। ২০ পিপিটি'র বেশি হলেই সুন্দরবন থেকে অনেক উদ্ভিদ ও জীবজন্তু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

    বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের প্রাক্তন অধ্যাপক আশিসকুমার পালের ব্যাখ্যা, ফারাক্কা ব্রিজ হওয়ার আগে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদ–নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ যতটা ছিল, তার থেকে এখন অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৪–এর জুলাইয়ে সাতজেলিয়ার কাছে বিদ্যা নদীতে (চার মিটার নীচে) লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ১২–১৭ পিপিটি। ওই বছরের এপ্রিলে হুগলি নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ৩০–৩২ পিপিটি। নভেম্বরে ছিল ৩.৪ পিপিটি। এর ফলে সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমছে।

    সুন্দরবনের নদ–নদীর উপরে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন কানাইলাল দাস। তিনি জানাচ্ছেন, সুন্দরবনের নদীগুলিকে মিষ্টি জলের জোগান দেয় গঙ্গা ও তার শাখা নদীগুলি। যেমন, মুড়িগঙ্গাকে মিষ্টি জল জোগায় হুগলি নদী। হাতানিয়া দোয়ানিয়া খালের মাধ্যমে মুড়িগঙ্গার জল গিয়ে মেশে সপ্তমুখী নদীতে। সপ্তমুখীর জলে আবার পরিপুষ্ট হয় ঠাকুরান নদী।

    এক সময় গঙ্গার মিষ্টি জল কলকাতার হেস্টিংস, কালীঘাট হয়ে বারুইপুর, জয়নগর খাঁড়ি, সুতুরবাগ নদী, কালোয়া নদী, গোবাদিয়া নদী, ঘুঘুডাঙা নদী হয়ে সপ্তমুখী নদীতে মিশত। এই পুরো প্রবাহটাই ছিল আদিগঙ্গা। তার একটি শাখা কালনাগিনী হয়ে সাগর দ্বীপের উপর দিয়ে বর্তমান কপিল মুনির মন্দিরের পূর্ব দিয়ে বঙ্গপোসাগরে পড়ত। আদিগঙ্গারই একটি শাখা মণি নদী হয়ে ঠাকুরান নদীতে গিয়ে পড়ত। আদিগঙ্গার অন্য একটি শাখা পিয়ালি নদীর যুক্ত।

    পিয়ালি নদী আবার মাতলা নদীতে গিয়ে মিশেছে। হুগলী নদীর একটি শাখা যমুনা নদী হয়ে হাসনাবাদ, হাড়োয়া, মিনাখাঁ ব্লকের ভিতর দিয়ে বিদ্যাধরী, করতোয়া হয়ে মাতলায় গিয়ে মিশত। ইছামতীর মিষ্টি জলে পরিপুষ্ট হতো কালিন্দী ও রায়মঙ্গল। এই সমস্ত নদ–নদী জায়গায় জায়গায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় নদীর উপরে নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। ফলে অনেক নদী তার গতিপথ পাল্টে ফেলেছে। তিনি বলেন, 'নদী সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে সুন্দরবনের নদ–নদীতে মিষ্টি জলের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন।'

  • Link to this news (এই সময়)