• সিপিএমের তরুণ ‘উজ্জ্বল’ মুখদের ডাক অভিষেকের, তৃণমূলে প্রতীকউর
    এই সময় | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: গত কয়েক দিনের জল্পনা শেষে তৃণমূলেই যোগ দিলেন প্রতীকউর রহমান (Pratik Ur Rahaman)। শনিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর হাতে জোড়াফুলের ঝান্ডা তুলে দিয়ে সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের উজ্জ্বল মুখদের তৃণমূলে (Trinamool) আসার আহ্বান জানালেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)।

    সিপিএমের তরুণ ব্রিগেডের আরও কয়েকজন সদস্য জোড়াফুলের সঙ্গে কথা চালাচ্ছেন বলেও শনিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তরুণ প্রজন্মের ‘ভালো’ নেতাদের তৃণমূলে আসার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি মহম্মদ সেলিমের (Md Salim) নেতৃত্বাধীন আলিমুদ্দিন স্ট্রিট নেতৃত্বকেও তীব্র আক্রমণ শাণিয়েছেন অভিষেক। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সেলিম–সহ এই নেতাদের জন্যই প্রতীকউরের মতো মুখ সিপিএম ছাড়ছেন। প্রতীকউরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের অন্দরে কয়েকজন ‘ঘুমন্ত শিশু’ মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

    এ দিন প্রতীকউর তৃণমূলের ঝান্ডা হাতে তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম প্রাক্তন এসএফআই রাজ্য সভাপতিকে দল থেকে বহিষ্কারের কথা ঘোষণা করে দেন। প্রতীকউরকে বহিষ্কার করলেও অভিষেক যে ভাবে বামেদের তরুণ প্রজন্মকে তৃণমূলে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন, তা আলিমুদ্দিন স্ট্রিট নেতৃত্বের উপরে আরও চাপ তৈরি করল বলে সিপিএমের একাধিক নেতার পর্যবেক্ষণ। এই তরুণ প্রজন্মকে সামনে রেখেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিট নিজের হারানো জনভিত্তি ফেরাতে চাইছে। এঁদের অনেককেই ২০২১–এর বিধানসভা এবং ২০২৪–এর লোকসভা ভোটে সিপিএম প্রার্থী করেছিল।

    অভিষেক দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলায় শনিবার নিজের কার্যালয়ের সাম‍নে প্রতীকউরের হাতে জোড়াফুলের পতাকা তুলে দেওয়ার আগে বলেন, ‘যদি কারও মনে হয়, এই দলে (সিপিএম) ১০–১২ বছর কাটিয়েছি...আমার কথা–দাবি–সাজেশনকে মান্যতা বা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, যদি তাঁদের মনে হয় একজ‍ন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থ করতে দলকে লাটে ওঠানো হচ্ছে— আমি তাঁদের কাছে আহ্বান জানাব, আমি চাইব আমার দলে তাঁরা আসুন।’

    যদিও সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের সব মুখকে যে তৃণমূল নেতৃত্ব এক বন্ধনীতে রাখছে না, সেটাও অভিষেক স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রতীকউরের মতো যাঁরা মাঠে–ময়দানে লড়াই করছেন, তাঁদেরই তৃণমূল চাইছে বলেও বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি।

    তৃণমূলের লোকসভার দলনেতার কথায়, ‘সিপিএমের এই প্রজন্মের যাঁরা লড়াই করছেন, প্রতীকউর তাঁদের অন্যতম। সিপিএমের যে মিছিল–মিটিং হয়, এঁদেরই দেখা যায়। বাকি সিপিএম টিভির পর্দায় রয়েছে আর সোশ্যাল মিডিয়া সব বিপ্লব করে।’ সিপিএমের কিছু যুব নেতাকে স্রেফ ‘পাউডার মেখে’ ঘুরে বেড়ানো নেতা বলেও কটাক্ষ করেছেন অভিষেক। তাঁর স্পষ্ট কথা, এই ধরনের যুব নেতাদের নিয়ে তৃণমূল উৎসাহী নয়। সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন নেতার উদ্দেশে অভিষেক এটাও বলেছেন, ‘যদি কেউ আসতে চান, আমি যতদিন আছি, চেষ্টা করব তাঁরা যেন সুযোগ পান।... কারও যদি মনে হয়, আমি আরও ৪–৫ বছর সময় দেবো। তাঁর সে অধিকার আছে। কোনও অসুবিধা নেই।’

    প্রতীকউরের পাশাপাশি গত কয়েক দিনে সৃজন ভট্টাচার্য ও দীপ্সিতা ধরকে নিয়েও সিপিএমের অন্দরে জোরদার চর্চা চলছে। সৃজন–দীপ্সিতাও কি তৃণমূলে যোগদান করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরে অভিষেক বলেন, ‘এই প্রশ্ন ওঁদের জিজ্ঞেস করুন।’ যদিও এই দু’জনই তৃণমূলে যাওয়ার জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন। দীপ্সিতা সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘ষড়যন্ত্র করে কয়েকটি নাম ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কয়েকজনের প্রতি অবিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এটা সফল হবে না।’ সৃজনের কথায়, ‘আমি কোথাও বলেছি যে, সিপিএম ছেড়ে অন্য কোথাও যাচ্ছি? যারা ভাসিয়েছে, সৃজন তৃণমূলে যাচ্ছে তারাই বলতে পারবে, কেন ভাসিয়েছে। আমাদের পার্টি নতুনদের অভিভাবকদের মতো আগলে রাখে। তাদের যত্ন নেয়।’

    অভিষেকের আহ্বান নিয়ে সিপিএমের তরুণ ব্রিগেড কী মনে করছে? সিপিএমের যুব সংগঠনের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, বর্তমানে দলের রাজ্য কমিটির সদস্য সায়নদীপ মিত্রের বক্তব্য, ‘সিপিএমের একজনকে নিয়ে তৃণমূল নিজেদের শুদ্ধ করতে চাইছে। কিন্তু পচা আলুর বস্তায় ভালো আলু গেলে সেটাও পচে চায়।’

    দলের আর এক যুব মুখ, রাজ্য কমিটির সদস্য শতরূপ ঘোষের কথায়, ‘ভাত ছড়ালে কাক পাওয়া যায়, কোকিল পাওয়া যায় না।’ সিপিএমের একটি গণসংগঠনের প্রথম সারির এক নেতা এবং এক অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন নেত্রী তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে জোড়াফুলের এক নেতার দাবি। প্রতীকউরের কথাতেও এর ইঙ্গিত রয়েছে। সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের আর কেউ জোড়াফুলে আসবেন কি না, সেই প্রসঙ্গে প্রতীকউর বলেছেন, ‘দলে (িসপিএম) দমবন্ধ পরিস্থিতি। অনেকেই মুখ খোলা শুরু করেছে। রাজপ্রাসাদের মধ্যে ঘুমন্ত শিশু জেগে উঠেছে। তারা বলছে, রাজা তোর কাপড় কোথায়?’

    সূর্যকান্ত মিশ্রের পরে সেলিম সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হওয়ার হতেই একদল তরুণ মুখকে দ্রুত আলিমুদ্দিন স্ট্রিট লাইমলাইটে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। এঁদের অনেককেই দ্রুত রাজ্য কমিটির সদস্য করা হয়। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় এই তরুণ ব্রিগেডের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। সেই তরুণ ব্রিগেডের সদস্য প্রতীকউরকে শনিবার বহিষ্কারের দলীয় সিদ্ধা‍ন্তের কথা ঘোষণা করে সেলিম বলেছেন, ‘প্রতীকউর রহমান শত্রু শিবিরে যোগ দেওয়ায় এবং পার্টি বিরোধী কাজ করার জন্য তাঁকে বহিষ্কার করেছি। মার্কসবাদী পথ ছেড়ে যে পথের সে পথিক হয়েছে, সেই পথে হেঁটে সাফল্যের শিখরে উঠুক। ভালো থাকুক। আ ম্যান নোন বাই দ্য কোম্পানি হি িকপস।’

    সেলিম তির্যক মন্তব্য করলেও অভিষেক সিপিএমের রাজ্য সম্পাদককেই বামেদের ভোট রামে যাওয়ার জন্য কাঠগড়ায় তুলেছেন। সিপিএম নেতাদের একাংশ গত কয়েক দিনে প্রচার করেছেন, প্রতীকউরের সঙ্গে তৃণমূলের ‘ডিল’ হয়েছে। যদিও অভিষেক স্পষ্ট বলেছেন, প্রতীকউর নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ভোটের টিকিটের জন্য তৃণমূলে আসেননি, সংগঠনের কাজ করতে এসেছেন। প্রতীকউরের নিজের কথায়, ‘একটাই ডিল হয়েছে, তা হলো বিজেপিকে আটকাব।’ যদিও সিপিএমের এই তরুণ নেতাদের কোনও জনভিত্তি নেই বলে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি। তাঁর কথায়, ‘এদের বেড়াল থেকে বাঘ বানানো হচ্ছে! এদের কোনও বেস নেই।’

  • Link to this news (এই সময়)