এই সময়, মেদিনীপুর: চোলাই ও বেআইনি মদের (ILLEGAL Alcohol) নেশায় প্রাণ হারিয়েছেন কারও স্বামী। কেউ হারিয়েছেন সন্তান। একের পর এক এমন ঘটনায় আতঙ্কিত পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর থানার মহিষদা গ্রামের মানুষ। মদ্যপানের জেরে সংসারে অশান্তি, ঝগড়া-বিবাদ থেকে আর্থিক বিপর্যয় নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের। গ্রামের বেশিরভাগ মহিলা অতিষ্ঠ হয়ে এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে সংঘবদ্ধ হয়ে অভিনব পথে হাঁটলেন। লাঠি-সোটা হাতে ভাটি ভাঙচুর নয়, বরং ঘরে ঘরে গিয়ে এর বিরুদ্ধে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে বেআইনি মদের কারবার বন্ধের দাবিতে আবেদন (Application) জমা দিলেন গ্রাম কমিটির প্রধানের কাছে। আবগারি দপ্তরের আধিকারিকদের মহিষদা অভিনেতা ও সাংসদ দেব-এর গ্রাম হিসেবেও পরিচিত। গ্রামের মহিলাদের অভিযোগ, কয়েক দশক ধরে গ্রামে চোলাইয়ের কারবার চলে আসছে। নেশার কবলে পড়ে এলাকার যুবকদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ঘটছে অকাল মৃত্যুর ঘটনা।
কেউ হারিয়েছেন স্বামীকে, কেউ সন্তান, কেউ ভাই বা দাদাকে। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই নেশা-যা নিয়ে গভীর উদ্বেগে অভিভাবকেরা। গ্রাম কমিটির প্রধান শিবপ্রসাদ ভূঁইয়া লিখিত আবেদন পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, 'গ্রামে এটা সত্যিই বড় সমস্যা। গ্রাম কমিটি আছে ঠিকই, কিন্তু এমন জটিল বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা প্রশাসন ও বিষয়টি জানাব এবং পরামর্শ নেব।' রাজ্যে বিষমদ ও চোলাই খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। ২০১১ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সংগ্রামপুরে বিষমদের ঘটনায় একসঙ্গে ১৪০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২২ সালে হাওড়ার ঘুসুড়িতে চোলাই খেয়ে মৃত্যু হয় ছয় জনের। পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না, পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালের গোপমহল-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় এরকম ছোট-বড় একাধিক ঘটনায় উত্তাল হয়েছে রাজ্য রাজনীতি। কোথাও কোথাও মহিলাদের (Women) সংগঠিত আন্দোলনে চোলাইয়ের কারবার বন্ধও হয়েছে। তবে মহিষদার ছবিটা কিছুটা আলাদা। অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে দীর্ঘদিন কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি। বরং পরোক্ষে মদের কারবার চালাতে ইন্ধন দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় মদের নেশায় অশান্তির জেরে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী মহিলারাই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। শ্রীমতি মিদ্যা ও শঙ্করী বাগ-সহ কয়েক জন মহিলা ঠিক করেন এর বিরুদ্ধে ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হবে। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন গ্রামের আরও মহিলা। শ্রীমতি মিদ্যা বলেন, 'আগেও নানা ভাবে চেষ্টা করেছি। লাভ হয়নি।
তাই এ বার ঝগড়া-বিবাদে না গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে আবেদন জানিয়েছি। অনেক মহিলা সমর্থন করেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবেই এই কারবার বন্ধ করতে চাই।' শঙ্করী বাগ বলেন, 'গরিব খেটে খাওয়া পরিবারের ছেলেরা নেশার কবলে পড়ছে। এই কারবার বন্ধ না হলে ভবিষ্যৎ খুব খারাপ।' স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য সুজয় প্রামাণিক বলেন, 'আমার কাছে কয়েক জন মহিলা এসেছিলেন। দলগত ভাবে হস্তক্ষেপ না করে গ্রাম কমিটির কাছেই আবেদন জানাতে বলা হয়েছিল। শুনেছি মহিলারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন।' জেলা পুলিশের এক কর্তা বলেন, পুলিশের কাছে এখনও কেউ কোনও অভিযোগ জানাননি। তবে খবর পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবগারি দপ্তরের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, সারা বছর জেলা জুড়ে অভিযান চলে। ওই গ্রামেও একাধিক বার অভিযান হয়েছে। প্রয়োজনে ফের অভিযান হবে। এখন দেখার, মহিষদা গ্রামের মহিলাদের এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়। প্রশাসনিক পদক্ষেপে বেআইনি মদের কারবার থেকে গ্রাম কবে মুক্তি পায়।