মাথার দাম ছিল ১ কোটি টাকা! ২৫০-র বেশি নিরাপত্তাকর্মী খুন, ১,০০০-এর বেশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র লুট এবং পুলিশি হেফাজত থেকে ৩০০ জন সঙ্গীকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো হাড়হিম করা অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি থিপ্পিরি তিরুপতি, মাওবাদী বৃত্তে যিনি ‘দেবুজি’ নামেই বেশি পরিচিত। রবিবার আত্মসমর্পণ করলেন সিপিআই (মাওবাদী)-র সর্বোচ্চ পদমর্যাদার এই নেতা।
এ দিন তেলঙ্গনা পুলিশের শীর্ষস্থানীয় আধিকারিকরা দেবুজির আত্মসমর্পণের খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, CPI (মাওবাদী) দলের ইতিহাসে এত বড় মাপের কোনও নেতার আত্মসমর্পণের নজির এর আগে নেই। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সকলের মনে একটাই প্রশ্ন— কে এই দেবুজি? কী ভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মাওবাদীদের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সেনাপতি?
৬২ বছর বয়সি দেবুজির জন্ম হয়েছিল তেলঙ্গনার জাগতিয়ালে। কোরুটলার গভর্নমেন্ট জুনিয়র কলেজে পড়ার সময় থেকেই অতিবামপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ‘র্যাডিক্যাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ বা RSU-তে। এই ছাত্রসংগঠন থেকেই উঠে এসেছিলেন বাসবরাজু ও সোনুর মতো মাওবাদীদের বড় নেতা। ১৯৮৬ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে তেলঙ্গনায় মাওবাদী সংগঠনে হাতেখড়ি হয়েছিল দেবুজির।
১৯৮৯ সালে তাঁকে মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলি ডিভিশনে বদলি করা হয়। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯৬ সালে দণ্ডকারণ্য স্পেশাল জ়োনাল কমিটির সদস্য এবং ২০০১ সালে তিনি সোজা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে পদোন্নতি পান।
মাওবাদীদের দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী বা PLGA তৈরির পিছনে ছিল তাঁরই মস্তিষ্ক। যার পুরস্কারস্বরূপ ২০১৯ সালে তাঁকে মাওবাদীদের সামরিক শাখা বা সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (CMC) প্রধান করা হয়। গত দুই দশকে ছত্তিসগড়, মহারাষ্ট্র এবং ওডিশায় হওয়া একাধিক ভয়াবহ মাওবাদী হামলার নেপথ্য কারিগর ছিলেন এই দেবুজিই।
মাওবাদী সংগঠনে বরাবরই উচ্চবর্ণের তেলুগু নেতাদের আধিপত্য দেখা গিয়েছে। কিন্তু দেবুজি ছিলেন মাদিগা দলিত সম্প্রদায়ের। গোয়েন্দাদের একাংশের মতে, গত বছর CPI (মাওবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক বাসবরাজু নিহত হওয়ার পরে দেবুজিকেই দলের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছিল। অনগ্রসর সম্প্রদায় থেকে উঠে এসে ক্যাডারদের একজোট করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
২০২৪ সাল থেকে নিরাপত্তাবাহিনীর লাগাতার অভিযানের জেরে মাওবাদীরা বর্তমানে কার্যত কোণঠাসা। সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সওয়াল করলেও, দেবুজি শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্যাডারদের আত্মসমর্পণ আটকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। সংগঠনে নতুন করে লোক নিয়োগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদেরও চরম অভাব দেখা দিয়েছে। মল্লোজুলা বেণুগোপাল রাও ওরফে সোনু-র মতো পলিটব্যুরো সদস্য আগেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
সশস্ত্র সংগ্রামের কট্টর সমর্থক দেবুজি দলের অন্য নেতাদের আত্মসমর্পণকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোণঠাসা সংগঠনে অস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাবে নিজের তৈরি করা গেরিলা বাহিনীর পতন ঠেকাতে পারেননি একসময়ের এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। এ বার নিজেই সে পথে পা বাড়ালেন। দেবুজির এই পদক্ষেপে মাওবাদী সংগঠন কার্যত নেতৃত্বহীন ও দিশাহীন হয়ে পড়ল বলে মনে করছেন ছত্তিসগড়ের বস্তার রেঞ্জের পুলিশ আধিকারিকরা।