নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বীরভূমে তৃণমূলের অন্দরের কোন্দল আছড়ে পড়ল অনুব্রত মণ্ডলের গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে। শনিবার বিকেলে দুবরাজপুর ব্লকের চিনপাইয়ে দলীয় কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে জয়দেব মোড়ের কাছে নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখে পড়েন কেষ্ট। জোড়াফুল আঁকা পতাকা হাতে দলের এক নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে অনুব্রতর কনভয় আটকে দেন একদল ক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মী। তাঁদের অভিযোগের আঙুল দুবরাজপুর ব্লকের যুগ্ম আহ্বায়ক তথা পদুমা গ্রাম পঞ্চায়েতের অঞ্চল সভাপতি তরুণ গড়াইয়ের দিকে। বীরভূমের মাটিতে অনুব্রত মণ্ডলকে এর আগে কবে এমন প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে মনে করতে পারছেন না জেলার পোড়খাওয়া নেতারাও। এনিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে জেলার রাজনৈতিক মহলে।
শনিবার বিক্ষোভরত কর্মীরা অনুব্রতর গাড়ির সামনে সমস্বরে ‘ওকে সরান দাদা’ বলে চিৎকার করতেঙ থাকেন। তাঁদের অভিযোগ, তরুণ গড়াই এলাকায় চূড়ান্ত ‘অত্যাচার’ চালাচ্ছেন এবং নানাভাবে আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। এই ধরনের ঘটনা ঘটবে তা কল্পনাও করতে পারেননি কেস্ট। কিছুটা অপ্রস্তুত দেখায় তাঁকে। তবে তিনি হাত নেড়ে কর্মীদের আশ্বাস দেন। কর্মীদের দাবি, অনুব্রতর হাতে একটি অভিযোগপত্রও তুলে দিয়েছেন তাঁরা। দলীয় কর্মীদের দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে পদুমার সভাপতি তরুণ গড়াই তিনটে গাড়িতে জনা চল্লিশ বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে এসে বোধগ্রামের একনিষ্ঠ কর্মী ও গ্রাম মোড়ল শেখ আসগর ওরফে আদানকে শারীরিক নিগ্রহ করেছেন। শেখ আসগর নিজেও অভিযোগ করেছেন যে, রাতের অন্ধকারে মদ্যপ অবস্থায় এলাকায় এসে দলীয় কর্মীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে এই নেতা। বিরোধীদের অবশ্য দাবি, এলাকায় অবৈধ বালির রাশ কার হাতে থাকবে এবং পঞ্চায়েতের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা নিয়েই এই বিবাদের সূত্রপাত।
যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন তরুণ গড়াই। তাঁর পালটা দাবি, কিছু লোক অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের তিনি প্রথম সারিতে রাখতে চাইছিলেন না বলেই এই চক্রান্ত করা হচ্ছে। কোনো ধরনের মারধরের ঘটনা ঘটেনি। তরুণ বলেন, স্রেফ কথা কাটাকাটি হয়েছিল। কিছু লোক অন্য কারও প্ররোচনায় তাঁকে বদনাম করার চেষ্টা করছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, অভিযোগকারীরা দলের ছত্রছায়ায় থেকে জোর করে প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের মতো নেতা তৈরি করতে চাইছেন। দলীয় নেতৃত্বকে মানছে না। এমনকী গ্রামে পার্টির কোনো প্রোগ্রাম করতে না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই ঘটনায় জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের অস্বস্তি কোনোভাবেই ঢাকা যাচ্ছে না। জেলা সহ সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বিষয়টিকে দলের ‘আভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে লঘু করার চেষ্টা করলেও স্বীকার করেছেন, কারও বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিক্ষোভ থাকতেই পারে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হবে। জেলা কোর কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। বিধানসভা ভোটের মুখে খোদ অনুব্রত মণ্ডলের পথ আটকে এই ধরনের প্রকাশ্য বিক্ষোভ বীরভূমে শাসক শিবিরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে ফের একবার নগ্ন করে দিল। রাজনৈতিক মহলের মতে, নীচুতলার কর্মীদের এই ক্ষোভ যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে আসন্ন নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এনিয়ে জেলা বিজেপির সহ সভাপতি দীপক দাস বলেন, তৃণমূলের এই অশান্তি নতুন কিছু নয়। বালি আর টেন্ডারের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ওদের দলের ভেতরেই যে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। সে কথা আজ অনুব্রত মণ্ডলের গাড়ি আটকে কর্মীরাই প্রমাণ করে দিলেন। অবৈধ বালির কারবার আর কাটমানির রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়েই এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। এদের কাছে মানুষের উন্নয়ন নয়, নিজেদের পকেট ভরানোই আসল লক্ষ্য। মানুষ সব দেখছে, আগামী নির্বাচনে তারা এর যোগ্য জবাব দেবে।