দুষ্প্রাপ্য ফরাসি বই-তুলটের পুঁথি! চন্দননগর লাইব্রেরিতে স্থানাভাবে বস্তাবন্দি রাজ-ঐশ্বর্য
বর্তমান | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সংবাদদাতা, তারকেশ্বর: রবীন্দ্রনাথ থেকে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ সহ একাধিক গুণীজনের পায়ের ধুলো পড়েছে চন্দননগর পুস্তকাগারে। এখানে বহু দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ রয়েছে। কিন্তু স্থায়ী গ্রন্থাগারিক, পর্যাপ্ত ভবনের অভাব। বইপত্র ডিজিটাল করার কাজ হচ্ছে না ফলে একপ্রকার ধুঁকছে ঐতিহ্যবাহী পুস্তকাগারটি। সরকার অবিলম্বে নজর দিক, আবেদন স্থানীয় বাসিন্দাদের।
১৮৭৩ সালে ১ অক্টোবর এই গ্রন্থাগার পথ চলা শুরু করে চন্দননগর উদ্দিবাজারে একটি ভাড়াবাড়িতে। পরবর্তীকালে নিত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির ভবনে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয়। স্থায়ী ঠিকানা পায় গ্রন্থাগার। এখানে বইয়ের সংখ্যা ৭০ হাজার ৫২৬। এর মধ্যে বহু প্রাচীন ও মূল্যবান পুস্তক যেমন আছে তেমনই আছে পুরনো সংবাদপত্র। সে সংখ্যা ১ হাজার ৮৮৬। এমনকি ফরাসি ভাষায় লেখা দুষ্প্রাপ্য ২৯০টি বইও রয়েছে। তুলট কাগজে লেখা পুঁথি পর্যন্ত আছে। সংখ্যাটি কম নয়, প্রায় ১১০টি। রেফারেন্স বইয়ের সংখ্যা ৩১ হাজার ৯৬। বর্তমানে গ্রন্থাগারের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৯৯৮। আর একটি চমকে দেওয়া তথ্য হল, দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি শুধু এখানেই আছে। অন্য কোথাও আছে বলে জানা যায় না। ১৮৮৬ সাল থেকে অমৃতবাজার পত্রিকার সমস্ত সংস্করণ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে দেশ, বসুমতী, ভারতবর্ষ, প্রবাসীর মত স্বাধীনতাপূর্ব একাধিক সংবাদপত্রের আর্কাইভ।
এসব কারণে বাংলার পাঠজগতের মানচিত্রে এই লাইব্রেরির গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, যদুনাথ সরকার, শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ একাধিক গুণী ব্যক্তির পা পড়েছে। এখনও লাইব্রেরিটি থেকে চন্দননগর উপ সংশোধনাগারের আবাসিকদের প্রতি সপ্তাহে বই পাঠানো হয় তাঁদের চাহিদামতো।
এককালের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সাক্ষী এই গ্রন্থাগারটি বর্তমান সময়ে এসে অন্ধকারে ঢাকছে। বর্তমানে একজন মাত্র গ্রন্থাগারিক আছেন। এটি ছাড়া আরামবাগ, হরিপাল ও চন্দননগরে আরও তিনটি লাইব্রেরির দায়িত্ব তাঁকে সামলাতে হয়। চন্দননগর পুস্তাকাগারে সোম, বুধ ও শনিবার শুধু থাকতে পারেন তিনি। এখন প্রবীণ ও নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে লাইব্রেরি লাভার্স গ্রুপ। তাঁরা যুক্ত প্রতিনিয়ত। স্থায়ী গ্রন্থাগারিক না থাকায় প্রতিদিন পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন পাঠকরা।
অনেকের দাবি, ন্যাশনাল লাইব্রেরিতেও নেই এমন বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য বই এখানে আছে। ডাচ, ফরাসিদের বাণিজ্য ইতিহাসের বহু অজানা তথ্য বন্দি এখানে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে তো বটেই এমনকি জাপান, ফ্রান্স, নেপাল, বাংলাদেশ থেকেও আসে পাঠক।
এখানে এখন বই রাখার পর্যাপ্ত জায়গার অভাব। তিনতলা করার জন্য ২০২৩ সালে আবেদন করা হয়েছিল। তবে এখনও সে কাজ বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও লাভার্স গ্রুপের সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন যাতে লাইব্রেরিয়ান থাকেন তার জন্য আবেদন জানাচ্ছি আমরা। বহু বই বস্তাবন্দি, ঘরবন্দি হয়ে পড়ে আছে। তিনতলা তৈরি হলে বইগুলি বেঁচে যায়। আর সংরক্ষণের জন্য অবিলম্বে বই ডিজিটাইজড করার প্রয়োজন। গ্রন্থাগারিক সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ভারতের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। ২০১৯ সালে মডেল লাইব্রেরি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। গ্রন্থ ডিজিটাইজড করার জন্য ন্যাশনাল আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।’