• বেহাল, প্রাণহীন বিশ্ববিদ্যালয়
    আনন্দবাজার | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গনের খোঁজে উত্তরবঙ্গের বর্ধিষ্ণু সাংস্কৃতিক শহর বালুরঘাটে এসে হতবাক হয়েছিলেন রাজ‍্যের এক পরিচিত শিক্ষাবিদ। ভাড়া করা গোটা দু’-তিন ঘরে ক্লাস হচ্ছে। গ্রন্থাগার, স্থায়ী শিক্ষকের নামগন্ধ নেই। জনা কয়েক অস্থায়ী অতিথি শিক্ষক এবং টেবিল, চেয়ার থাকলেই কি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হতে পারে?

    বছর পাঁচেকে ছবিটা সামান‍্যই পাল্টেছে বালুরঘাটে দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতকোত্তরে পড়ানো হচ্ছে সাকুল‍্যে ইংরেজি, অঙ্ক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান। প্রথম দিকে অঙ্কের দু’-এক জন শিক্ষার্থী আসছিলেন। এখন সংখ‍্যাটা ১৮ জন। একটি পরিত‍্যক্ত কলেজ হস্টেলে খোলা উঠোন ঘিরে দু’টি বর্ষের খান কয়েক ক্লাসঘর। একটি অফিস ঘর এবং উপাচার্য মশাইয়ের কক্ষও রয়েছে।

    সব মিলিয়ে রাজ‍্যের বিশ্ববিদ‍্যালয় সমূহের যা দশা, তাতে অবশ‍্য স্রেফ উপাচার্য থাকলেই বিশ্ববিদ‍্যালয়ের লটারি-ভাগ‍্য খুলেছে বলা যায়। কারণ, ভাগ‍্যবিধাতাদের বিচিত্র মেজাজ মর্জি! কলকাতা, যাদবপুর-সহ রাজ‍্যের ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে টানাপড়েন চলে আড়াই বছর ধরে। উত্তরবঙ্গ, ম্যাকাউট এবং মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ভিসি-বিহীন। ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ‍্যগ্র মেদিনী’-ভঙ্গিতে নবান্ন এবং রাজভবনের (অধুনা লোকভবন) সংঘাত চলছে। কেন্দ্র-রাজ‍্য রাজনীতির ছায়ায় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের পাঠ শিকেয় উঠলেও কারও তাপ-উত্তাপ নেই।

    ফি-বছর বাজেট বক্তৃতায় রাজ‍্যের তরফে অবশ‍্য বিশ্ববিদ‍্যালয়ের সংখ‍্যা নিয়ে বড়াইয়ের অন্ত নেই। ১৪-১৫ বছরে ১২ থেকে ৩১টি রাজ‍্য পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়সুদ্ধ মোট ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তার ঘটেছে। সেই সঙ্গে ৫০০-র বেশি কলেজ, ৫৩টি সরকারি কলেজ পত্তনের আখ‍্যানও রাজ‍্যের বাজেট-গীতির অপরিহার্য ‘আইটেম’! কিন্তু বাস্তবে এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকারিতা খুঁড়ে দেখলে লজ্জায় পড়তে হবে। গত এক দশকে রাজ্যের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে ব্যতিক্রম বলতে বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়। বাকি বেশ কয়েকটির পরিকাঠামো নেহাতই শিশু অবস্থায়।

    রাজ‍্যের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই নির্দিষ্ট বিধি চূড়ান্ত হয়নি। বা হলেও যে কোনও ছোট বড় সিদ্ধান্তে ভরসা হিসেবে উপাচার্যই একমেবাদ্বিতীয়ম। ফলে বছরের পর বছর ভিসি না-থাকায় ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় বা বারাসত রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় চরম দুর্ভোগের শিকার। বারাসতের এক শিক্ষক বলছিলেন, “আমাদের ডিন নেই। ভিসিই সর্বেসর্বা। গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ, পিএইচ ডির মূল‍্যায়নের বন্দোবস্ত সব কিছুতে ভিসিই প্রথম ও শেষ কথা। কয়েক বছর উপাচার্য না থাকায় জনা ৬৩ গবেষকের কান্নাকাটির দশা হয়েছিল!”

    মুক্ত বিশ্ববিদ‍্যালয়েরও অনেকটা তেমনই অবস্থা। সব থেকে বেশি দিন ভিসিহীন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় সব বিশ্ববিদ‍্যালয়েই শিক্ষক, অধ‍্যাপক, আধিকারিকদের বিপুল শূন‍্য পদ। দীর্ঘদিন ভিসিহীন দশা থাকায় তাঁদের পদোন্নতিও বিশ বাঁও জলে পড়েছে।

    অনেকে আবার মনে করেন, রাজ‍্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ইতিহাসে অভূতপূর্ব এই উপাচার্য-সঙ্কট বাদ দিলেও যত্র তত্র বিশ্ববিদ্যালয় বিস্তারের ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের’ জেরেও বাস্তবে লাভের লাভ কিছু হচ্ছে না। মংপোর দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটি এখনও ভাল করে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু কার্শিয়াংয়েই প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ‍্যালয়ের নতুন শিক্ষাঙ্গনের কাজ এগোচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, উচ্চ শিক্ষা বিস্তারের পরিকল্পনার সামগ্রিক ধাঁচ নিয়েই। প্রেসিডেন্সির রেজিস্ট্রার দেবজ‍্যোতি কোনারের ব‍্যাখ‍্যা, “একটি এলাকার সামাজিক বিন‍্যাস বিশ্লেষণ করেই আমরা এগোচ্ছি। শিল্পক্ষেত্র, কর্পোরেট, পেশাগত পরিসরের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়েই প্রেসিডেন্সির নতুন শিক্ষাক্রমেও অভিনবত্ব নিয়ে ভাবা হচ্ছে।”

    থোড় বড়ি খাড়া কিংবা খাড়া বড়ি থোড়ের উচ্চ শিক্ষা যে চলবে না , তা অবশ‍্য খাস কলকাতার কলেজগুলির ছবিতেই পরিষ্কার। বহু নামী কলেজেই পদার্থবিদ‍্যা, রসায়নের মতো বিষয়ে ক্লাসে মাস্টারমশাই কার্যত মাছি তাড়াচ্ছেন। অর্থনীতি, দর্শনের দশাও সর্বত্র ভাল নয়। পালি থেকে ফার্সি, কিছু পুরনো বিষয়ের পাঠেও পড়ুয়ারা স্পষ্ট মুখ ঘুরিয়েছেন। আবার আত্রেয়ী নদীর পাড়ে বালুরঘাটে ইংরেজির চাহিদা বাড়ছে। এক শিক্ষক বলছিলেন, “এমন ছাত্রও আছেন, যাঁকে রুটিরুজির কাজ সামলে ক্লাস করতে হয়, বা কারও পকেটে রোজ মালদহে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ারও রেস্ত নেই। বালুরঘাটে বিশ্ববিদ্যালয় হল বলে, তাঁদের পড়াশোনা চলছে।” কিন্তু উত্তরবঙ্গে রসায়নের অধ‍্যাপক, বালুরঘাটের উপাচার্য প্রণব ঘোষ দায়িত্বে এসে আরও সাতটি বিষয়ের পাঠ চালু করতে চান। যা পরিকাঠামো, তা কী ভাবে হবে, সেই দিশা নেই।

    কৃষ্ণনগর কলেজের মাঠে কন‍্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মতুয়া-প্রধান ঠাকুরনগরে প্রমথরঞ্জন ঠাকুর গভর্নমেন্ট কলেজে ভাড়ার ঘরে হরিচাঁদ গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকে থাকাও এমন প্রতিকূলতা ঠেলেই। হরিচাঁদ গুরুচাঁদে সাংবাদিকতা পড়ার ঝোঁক ভালই ছিল শুরুতে। কিন্তু স্থায়ী পদাধিকারীদের অভাবে অনেক কিছুই দিশা হারাচ্ছে। কন‍্যাশ্রীতেও বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞানই পড়ানো হয়। কন‍্যাশ্রীর প্রতিষ্ঠাতা-উপাচার্য মিতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় বলেন, “প্রান্তিক মেয়েদের শিক্ষায় ভাল উদ‍্যোগ। মেয়েদের নেট, স্লেটের তালিমও দেওয়া হয়েছে।” অনেকের আশা, কলেজে চাকরির দরজা খুলতে নতুন পরীক্ষা হলে হয়তো এর সুফল বোঝা যাবে।

    একদা রাজ‍্যের প্রথম সারির কলেজ বহরমপুরে মহারাজ কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে উন্নীত, মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা তুলনায় ভাল সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে। শিক্ষক সংখ‍্যায় এগিয়ে তারা। কিন্তু অধ‍্যাপক পদের শিক্ষক, ল্যাবরেটরিতে গবেষণার উপযোগী পরিকাঠামো নিয়ে সমস‍্যা। ক্লাসের সুষ্ঠু আয়োজনে ক‍্যাম্পাসের বিস্তারও দরকার। তা হলেই পিএইচ ডি করানো বা নাক-মানচিত্রে নিজেদের নাম তোলার স্বপ্নটুকু দেখতে পারে মুর্শিদাবাদ। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ‍্যালয়ের জন্য এটুকুও দুরাশা।

    ২০২০-র নতুন শিক্ষানীতির হাত ধরে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরে পাঠের খোলনলচেই ক্রমশ পাল্টে যেতে বসেছে। ছক-ভাঙা শিক্ষাক্রমের খোঁজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু নামী কলেজই স্বশাসনের দিকে ঝুঁকছে। তা না হলে লাফিয়ে লাফিয়ে শিক্ষার্থী কমছে স্নাতক বা উচ্চতর স্তরে। এই অবস্থায় প্রশ্ন, নবীন শিক্ষার্থীদের ক্ষমতায়নের শরিক হতে কোন দিশা দেবে রাজ্যের প্রান্তিক এলাকার বিশ্ববিদ‍্যালয়?
  • Link to this news (আনন্দবাজার)