বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট এখনও ঘোষণা হয়নি। কিন্তু তার আগেই অশোকনগর বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে জোরদার রাজনৈতিক দর কষাকষি শুরু হয়ে গিয়েছে। মূলত আইএসএফ এবং সিপিএমের মধ্যে আসন রফা নিয়ে প্রাথমিকস্তরে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জেলা সূত্রে খবর।
জেলা আইএসএফ নেতৃত্বের দাবি, আসন্ন বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের কাছে তারা উত্তর ২৪ পরগনায় আটটি আসন দাবি করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে—অশোকনগর, মধ্যমগ্রাম, আমডাঙা, দেগঙ্গা, হাড়োয়া, বাদুড়িয়া, মিনাখাঁ এবং বসিরহাট উত্তর।
আইএসএফের রাজ্যের সহ-সভাপতি তথা দলের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সভাপতি তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “দলের শক্তি ও সাম্প্রতিক ভোটের ফলাফলের নিরিখে আমরা আটটি আসনের দাবি জানিয়েছি। অশোকনগর তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।”
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অশোকনগর কেন্দ্র থেকে আইএসএফ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তাপস। জয়ী না হলেও প্রায় ৪৬ হাজার ভোট পান। যদিও সে সময়ে বাম শিবিরের একাংশের মধ্যে আইএসএফকে আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্বস্তি ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। প্রচারে সেই অনীহার ছাপও দেখা গিয়েছিল বলে অভিযোগ।
পরবর্তীতে লোকসভা নির্বাচনে বারাসত কেন্দ্র থেকেও আইএসএফ প্রার্থী হন তাপস। অশোকনগর বিধানসভা এলাকায় তিনি প্রায় ২৬ হাজার ভোট পান। আইএসএফ নেতৃত্বের দাবি, ওই নির্বাচনে তারা বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থীর তুলনায় অশোকনগরে বেশি ভোট পেয়েছিল। সেই ফলাফলকে হাতিয়ার করেই তারা আসনের দাবি জোরদার করছে।
আইএসএফের দাবি, অশোকনগর বিধানসভা এলাকার আটটি পঞ্চায়েতেই তাদের সদস্য রয়েছে। মোট সংখ্যা ১৮। তুলনায় সিপিএমের সদস্য ছিলেন আট জন, যার মধ্যে এক জন ইতিমধ্যেই তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। আটটির মধ্যে মাত্র দু’টি পঞ্চায়েতে— গুমা ২ ও বিড়া রাজীবপুরে সিপিএমের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে বলে আইএসএফের দাবি।
সিপিএমের স্থানীয় কর্মীদের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, সাংগঠনিক ভাবে তারা আইএসএফের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। নিয়মিত মিটিং-মিছিল-জনসভায় ভিড়, তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় যোগদান এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনসংযোগ— এ সবই তাদের শক্তির প্রমাণ বলে দাবি সিপিএম নেতৃত্বের।
দলের একাংশের মতে, অশোকনগর বিধানসভা এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় ২৬ শতাংশ। বাকি ভোটারদের বড় অংশই উদ্বাস্তু সমাজভুক্ত, যার মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তাদের যুক্তি, এই সামাজিক বিন্যাসে আইএসএফ প্রার্থী দিলে জয়লাভ কঠিন হবে।
তা ছাড়া, পুরসভা এলাকায় আইএসএফের সংগঠন কার্যত নেই বলেই দাবি সিপিএমের। গত পুর নির্বাচনে তারা প্রার্থী দিতে পারেনি। এমনকি, সাম্প্রতিক লোকসভা ভোটে বহু বুথে আইএসএফ পোলিং এজেন্টও দিতে পারেনি— এই অভিযোগও উঠছে বাম শিবির থেকে।
অশোকনগর দীর্ঘদিন ধরেই সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। বিধানসভা, পুরসভা, পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি— সব স্তরেই এক সময়ে তাদের দখল ছিল। কিন্তু গত এক দশকে রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রভাব কমেছে।
এই পরিস্থিতিতে আইএসএফ নিজেদের ‘উদীয়মান শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের পাশাপাশি যুবসমাজের সমর্থন পাওয়ার দাবি করছে তারা। অন্য দিকে, সিপিএম চাইছে ঐতিহ্যগত সংগঠনভিত্তিক রাজনীতির জোরে আসনটি নিজেদের দখলে রাখতে।
সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তথা অশোকনগরের প্রাক্তন বিধায়ক সত্যসেবী কর বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। সমস্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান রাজ্য নেতৃত্বের কাছে আছে। তারাই ঠিক করবেন, অশোকনগরে কারা প্রার্থী হবেন।”