গান্ধীজির নির্দেশে মুখ্যমন্ত্রী হন, পশ্চিমবঙ্গের চেহারা বদলে দিয়েছিলেন 'ভারতরত্ন' বিধানচন্দ্র
আজ তক | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্বাধীনতা উত্তর পশ্চিমবঙ্গের সফল মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম বিধানচন্দ্র রায়। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। রাজ্য যখন খাদ্য সংকট, উদ্বাস্তু সমস্যায় জর্জরিত তখন দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। তবে সব প্রতিকূলতার মোকাবিলা তো করেইছিলেন, সঙ্গে এনেছিলেন উন্নয়নের জোয়ার। বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসকও। প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয়। কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়রও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
শৈশব ও লেখাপড়া
বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ১ জুলাই ১৮৮২ সালে বিহারের পাটনা শহরে। তাঁর বাবা প্রভাতচন্দ্র রায় ছিলেন সরকারি কর্মচারী এবং মা অঘোরকামিনী দেবী ছিলেন সমাজসেবী। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী, পরিশ্রমী ছিলেন। ছোটো থেকেই সামাজিক কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। সেই আদর্শ থেকেই পরবর্তীতে চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পাটনাতেই। পরে তিনি স্থানীয় কলেজ থেকে গণিতে অনার্সসহ বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর চিকিৎসাবিদ্যা পড়ার জন্য কলকাতায় আসেন এবং কলকাতা মেডিকেল কলেজ–এ ভর্তি হন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং St Bartholomew's হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এম.আর.সি.পি. (MRCP) ও এফ.আর.সি.এস. (FRCS) ডিগ্রি পান।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও গান্ধীজির সঙ্গে সম্পর্ক
বিধানচন্দ্র রায় যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তখন তিনি একজন নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসক। তাঁর দলীয় রাজনীতির মধ্যে আসা অপ্রত্যাশিত। নির্বাচনে জিতে প্রথম নজর কাড়েন। সেটা ১৯২৩ সাল। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের বিরুদ্ধে। সেই ভোটে তিনি জেতেন।
আগে থেকেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে আদর্শ বলে মানতেন। কিন্তু নির্বাচনে জেতার পর দেশবন্ধুর সঙ্গে যোগ দেন স্বরাজ্য দলে। এরপর ১৯২৮ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। যদিও আগে থেকে চিকিৎসক হিসেবে মহাত্মা গান্ধী তাঁকে চিনতেন। কিন্তু কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। গান্ধীজির চিকিৎসকও ছিলেন তিনি। ১৯৩১ ও ১৯৩৩ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।
১৯১০ ও ১৯২০-এর শুরুর দিকে গান্ধীজি একাধিকবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন বিধানচন্দ্র রায়কে চিকিৎসার জন্য ডাকা হয়েছিল। গান্ধীজি বিধানচন্দ্র রায়ের সততা, মেধা ও কর্মনিষ্ঠার প্রশংসা করতেন। কংগ্রেসের ভেতরে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গান্ধীজি তাঁর পরামর্শও নিতেন।
বিনা পয়সায় রোগী দেখতেন বিধানচন্দ্র
বিধানচন্দ্র রায় বলেছিলেন, 'আমি গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বুঝি না। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল মানুষ। সাধারণ মানুষকে কত বেশি সুবিধা দেওয়া যায়, শুধু সেটা বিবেচনা করি।' কাজেও তাই করতেন তিনি। প্রতিদিন ভোট ছটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করতেন। এমনকী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও দেখতেন রোগী। প্রতিদিন ১৬ জন রোগী তাঁর কাছে বিনা পয়সায় চিকিৎসা পেতেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁর রোগী ছিলেনই। তালিকায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরুর মতো বিখ্যাত মানুষজন।
গান্ধীজির নির্দেশে মুখ্যমন্ত্রী
১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী করা হয় প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে। তবে মাত্র ১৬০ দিন সেই আসনে ছিলেন। তাঁকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে সরানো হয়। রাজ্যে তখন দাঙ্গা, উদ্বাস্তু সমস্যা, খাদ্য সংকট। এই সময় বিধানচন্দ্র রায়কে মুখ্যমন্ত্রী হতে বলেন গান্ধীজি। তিনি সেই নির্দেশ পালন করেন।
স্বাধীন পশ্চিমবঙ্গে বিধানচন্দ্র রায় প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যিনি টানা প্রায় ১৪ বছর ওই আসনে ছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের পর তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই দায়িত্ব পালন করেন। যদিও তখন কংগ্রেস দল তাঁকে নির্বাচিত করেছিল। ১৯৫২ সালে প্রথম বিধানসভা ভোট হয়। সেই ভোটে জয়ী হন তিনি। তারপর ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালের ভোটেও জিতে রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রধান হয়েছিলেন। ১৯৫২, ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বৌবাজার আসন থেকেই প্রার্থী হয়েছিলেন। ওই আসন থেকে জয়ী হয়েই তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আধুনিক বাংলার রূপকার
বিধানচন্দ্র রায়কে আধুনিক বাংলার রূপকার বলা হয়ে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪ বছরের মেয়াদ কালে বিধানচনন্দ্র রায় চিকিৎসা, শিল্প, নগর উন্নয়নে যা যা কাজ করেছিলেন, তা আর কোন মুখ্যমন্ত্রী পারেননি। তাঁর আমলেই দুর্গাপুর, কল্যাণী ও সল্টলেক গড়ে তোলা হয়েছিল।
দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট নির্মাণ, চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ওয়ার্কস–এর সম্প্রসারণ ও হলদিয়া বন্দরের পরিকল্পনা ও ভিত্তি প্রস্তুতি হয়েছিল। শিক্ষাক্ষেত্রে আইআইটি খড়গপুরের বিকাশ, এসএসকেএম হাসপাতালের আধুনিকীকরণ করা হয়েছিল। একাধিক মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণ তাঁর কৃতিত্ব। বেসরকারি বহু কোম্পানির প্রতিষ্ঠাও হয়েছিল সেই আমলে।
ভারতরত্ন
দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন দেওয়া হয়েছিল বিধানচন্দ্র রায়কে। ১৯৬১ সালে এই সম্মান পাওয়ার পর বছর ১ জুলাই তিনি মারা যান। সেদিন তাঁর জন্মদিনও ছিল।