• স্বাধীনতার দিনই দায়িত্ব, মাত্র ১৬০ দিনে ইতি; প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের মুখ্যমন্ত্রিত্বের কাহিনি
    আজ তক | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন স্বাধীনতার ঠিক পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে বাংলা বিভক্ত হয়। পূর্ববঙ্গ যায় পাকিস্তানের অংশে (পরে বাংলাদেশ ও পশ্চিমাংশ হয় ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। দেশভাগের পর নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ। যেমন উদ্বাস্তু সমস্যা, খাদ্য সংকট, প্রশাসনিক পুনর্গঠনের চাপ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ইত্যাদি। এই কঠিন পরিস্থিতিতে নতুন রাজ্যের নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। তৎকালীন শাসক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে নির্বাচিত করে। তিনি ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

    কে এই প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ? 

    প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের জন্ম ২৪ ডিসেম্বর ১৮৯১ সালে। তিনি ছাত্রাবস্থা থেকে কংগ্রেস দল করতেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন।  তৎকালীন পূর্ববঙ্গের এক শিক্ষিত বাঙালি পরিবারে জন্মানোর সুবাদে তাঁর শিক্ষার পরিমণ্ডল ভালো ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী, শান্ত স্বভাবের ও অধ্যয়নমুখী ছিলেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পূর্ববঙ্গেই সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় আসেন। সেখানেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং এই বিষয়ে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদেশেও (ইংল্যান্ডে) গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য।

    প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ ও স্বাধীনতা আন্দোলন 

    প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কংগ্রেস নেতা। সেভাবে তিনি প্রচারের আলো কোনওদিন পাননি। তবুও বাংলায় সংগঠন গড়ে তোলা ও আন্দোলন পরিচালনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে নজর কেড়েছিলেন তিনি। তাঁর মধ্যে নেতৃত্ব গুণ ছিল। সিভিল অবিডিয়েন্স আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নজরদারি ও দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। 


    প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকেই কেন মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল? 

    প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল মূলত স্বাধীনতার ঠিক পরবর্তী সংকটময় পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষিত, সৎ ও সংগঠক-নেতৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল বলেই। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ চরম অস্থিরতার মধ্যে ছিল উদ্বাস্তু ঢল, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। কংগ্রেস নেতৃত্ব মনে করেছিল তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির প্রফুল্লচন্দ্রকে ক্ষমতা দিলে তিনি তার প্রতি সুবিচার করবেন। একই সঙ্গে তাঁর সংগঠনিক দক্ষতা এবং অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছিল।

    ব্যক্তিগত জীবনে সৎ ও মিতব্যয়ী ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। তিনি কোনও বড় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন না, ফলে দলীয় ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর নাম গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই সব কারণ মিলিয়েই স্বাধীনতার দিন, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এ, তাঁকেই পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

    মুখ্যমন্ত্রিত্ব স্থায়ী হয়নি বেশিদিন 

    সৎ, নীর্ভি রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষকে মুখ্যমন্ত্রীর আসন দেওয়া হলেও তিনি মাত্র ১৬০ দিন ছিলেন ক্ষমতায়। কারণ স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির ও জটিল। এই কঠিন পরিস্থিতিতে সরকারের উপর জনঅসন্তোষ দ্রুত বাড়তে থাকে। তাঁর নেতৃত্বে সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও কংগ্রেসের ভিতরেই নেতৃত্ব নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়। দলের একাংশ মনে করছিল আরও শক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। ফলে দলীয় সিদ্ধান্তে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ডা. বিধানচন্দ্র রায়। 

    কংগ্রেস ত্যাগ ও নিজের পার্টি গঠন 

    কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধের পরে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ নিজেই একটি রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হন। পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। একটি আঞ্চলিক দল গঠনে ভূমিকা নেন। তিনিই পরবর্তীকালে বাংলা প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৬০ এর দশকে এই দল যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনে অংশগ্রহণ করে। পরে খুব অল্প সময়ের জন্য মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছিলে। সেটা ১৯৬৭ সাল। কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তখনই তিনি দলত্যাগ করেননি। তবে সংসদীয় রাজনীতিতে টিকে থাকতে চেয়েছিলেন। 

    মৃত্যু 

    প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পর একেবারেই সাদামাটা জীবনযাপন করতে থাকেন। ১৯৬০ এর দশকের শেষভাগে সক্রিয় দলীয় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি জনজীবনে তেমন প্রচারে থাকেননি। ব্যক্তিগত সততা ও নীতিবোধের জন্য পরিচিত ছিলেন। গান্ধীবাদি নেতা হিসেবে তাঁর নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 
    ১৮ জানুয়ারি ১৯৮৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। 

    মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অবদান

    তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব দীর্ঘস্থায়ী না হলেও সেই অল্প সময়েই নবগঠিত রাজ্যের প্রশাসনিক ভিত্তি গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল বাংলায়। দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে চলে আসায় রাজ্যজুড়ে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি উদ্বাস্তু পুনর্বাসন ও ত্রাণব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। একই সঙ্গে খাদ্যসংকট মোকাবিলায় রেশনিং ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেন, যাতে শহর ও গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পৌঁছায়। নতুন রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করানোও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতীয় শাসনে রূপান্তরের সময় সরকারি দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নতুনভাবে সংগঠিত করতে হয়। তাঁর সরকার মাত্র কয়েক মাস স্থায়ী হয়, তবুও স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনে তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক। 
  • Link to this news (আজ তক)