ইদানীং কবি-সাহিত্যিক মহলের একাংশ সমাজ মাধ্যমে প্রশ্ন তুলছেন ‘আজও কি কেউ পড়েন বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র বা বিভূতিভূষণ?’ কারণ, সমকালীন প্রকাশনা-বাজারে নবীন প্রজন্মের মধ্যে হরর ও ক্রাইম-থ্রিলার উপন্যাসের জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বইমেলায় বেশিরভাগ স্টলে হরর ও ক্রাইম-থ্রিলারের পাঠকের ভিড়, অনলাইন রিভিউ বা সিরিজ-নির্ভর পাঠ-উন্মাদনা— সব মিলিয়ে নতুন ধারার প্রায় সুবিদিত এক বাণিজ্যিক বিজয়-যাত্রা চলছে যেন দিকে দিকে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে— এই রমরমার ভিড়ে কি প্রকৃত সাহিত্য হারিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নটি ভীষণ কঠিন। কারণ এর ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে আসল তথা নিবিড় সাহিত্য-ভাবনার নীরব পরিবর্তন, পাঠক-মনস্তত্ত্বের অঘোষিত রূপান্তর এবং বাজার-অর্থনীতির সুপ্রাচীন প্রসঙ্গও। কিছু দিন আগে উত্তর থেকে দক্ষিণের সবখানেই জেলাভিত্তিক বইমেলার মরসুম থেকে শুরু করে কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলাতেও হরর স্টোরি ও ক্রাইম-থ্রিলারের কৌতূহলী পাঠকের সংখ্যা ছিল প্রচুর। এর কারণ ঠিক কী? তা হলে সত্যিই কি প্রকৃত সাহিত্য পাঠক কমে যাচ্ছে? প্রকৃত সাহিত্যই বা আমরা কাকে বলব?
এ সব স্পষ্ট ও অস্পষ্ট বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তিন ভাবে খোঁজার চেষ্টা করা যায়। প্রথমত, হরর ও ক্রাইম-থ্রিলারের কাঠামো যে কোনও পাঠকের কাছে কৌতূহল-নির্ভর আয়োজন। রহস্যের জট, ভূত-প্রেত ও রোমাঞ্চকর পালাবদল বা অপ্রত্যাশিত মোড়, এ সব উপাদান পাঠকদের কল্পনার সুবিস্তৃত ঘরানায় অদ্ভুত জগতে তাড়িত করে থাকে সহজেই। ফলে পাঠের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে তাৎক্ষণিক উত্তেজনাময়। কিন্তু এই গতি ও উত্তেজনাই যে এক সময় চরিত্রের গভীর মনস্তত্ত্ব, ভাষার নান্দনিকতা বা জীবন-দর্শনের সূক্ষ্ম অনুসন্ধান আড়াল করে দেয়, সে বিষয়ে এই সময়ের পাঠকের মনোযোগ দেখা যাচ্ছে না একদমই। পাঠক গল্পের মধ্যে ‘কী ঘটল’-এর ভিতরেই আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। কিন্তু ‘কেন ঘটল’ বা ‘ঘটনার মানবিক তাৎপর্য কী’, সেই অনুসন্ধান প্রায়শই অনুল্লিখিত ও অনাবিষ্কৃত থেকে যায় তাঁদের কল্পনায়। এখানেই প্রকৃত সাহিত্য ও বর্তমান সময়ের পাঠকের অন্তর্জগৎ, সমাজ-বাস্তবতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে গভীর ভাবে অন্বেষণ করা যায়।
দ্বিতীয়ত, প্রকাশনা-শিল্পের বাজারনীতি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। বিক্রয়-সংখ্যাই যেখানে সাফল্যের মাপকাঠি, সেখানে দ্রুতপাঠ্য, সিরিজ-নির্ভর থ্রিলার ও হরর স্টোরি স্বাভাবিক ভাবেই অগ্রাধিকার পায়। নতুন লেখকেরাও প্রায়শই বাজারের চাহিদা মেনে রহস্যঘন কাহিনির দিকে ঝুঁকছেন নিয়মিত। ফলে পরীক্ষামূলক ভাষা, দার্শনিক ভাবনা বা সামাজিক বিশ্লেষণভিত্তিক উপন্যাস তুলনামূলক ভাবে কম দৃশ্যমান হয়ে পড়ছে। দৃশ্যমানতার এই সঙ্কটকেই অনেকে ‘প্রকৃত সাহিত্য হারিয়ে যাওয়া’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
তবে এই পর্যবেক্ষণের বিপরীত দিকও রয়েছে। ক্রাইম ও থ্রিলার নিজেও এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যধারা, যার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। ফিওদোর দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ বা আর্থার কোনান ডোয়েলের ‘শার্লক হোমস’ রহস্য ও অপরাধকে কেন্দ্র করেই মানব-মনস্তত্ত্ব ও সমাজবাস্তবতার অনন্য গভীর বিশ্লেষণ করেছে। অর্থাৎ, এই ধারা কিন্তু কখনওই স্বয়ং সাহিত্যবিরোধী নয়। বরং এর সার্থকতা নির্ভর করে রচনার গভীরতা ও শিল্পমানের উপরে। সমসাময়িক বহু লেখকও অপরাধ-আখ্যানের ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন তুলছেন, এ কথা অস্বীকার করার নয়।
অতএব, এই সমস্যা ধারার নয়, বরং ভারসাম্যের। যখন পাঠক শুধুমাত্র উত্তেজনা-নির্ভর ভোগ্যপাঠে সীমাবদ্ধ থাকেন, তখন সাহিত্য তার আত্মানুসন্ধানী শক্তি হারাতে পারে। কিন্তু যদি ক্রাইম ও থ্রিলার মানবজীবনের জটিলতা উন্মোচনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে সেটিও অচিরেই ‘প্রকৃত সাহিত্য’-র অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
সর্বোপরি, প্রকৃত সাহিত্য কখনও সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় না, যেতে পারে না, সময়ে তার রূপ বদল হয় শুধু। তাই শুধু প্রয়োজন সমালোচনামূলক পাঠদৃষ্টি, বিচক্ষণ প্রকাশনা-নীতি এবং লেখকের শিল্পসচেতনতা। হরর ও ক্রাইম-থ্রিলারের জনপ্রিয়তার ভিতরেও যদি আমরা গভীর মানবিক সত্য অনুসন্ধান করতে পারি, তবে প্রজন্মের পরে প্রজন্মের মধ্যেও সাহিত্য পাঠের রূপ, রস ও গন্ধ পাঠক-ভোগ্য হয়ে উঠবে।