শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: হাওড়ায় প্রোমোটার শফিক খান খুনে অভিযুক্ত হারুন খানের ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার বাবা আফগানিস্তানের নাগরিক হলেও ভুয়ো নথি বানিয়ে সে ভারতীয় নাগরিক সেজেছিল। ওই জাল নথি দেখিয়েই ছেলে হারুণ এদেশে ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড সহ বিভিন্ন নথি তৈরি করে পিলখানায় বাসা বেঁধেছিল। স্থানীয় এক ব্যক্তিই তাকে এই জাল নথি জোগাড় করে দিয়েছিল। শফিক খুনের মামলায় মূল অভিযুক্ত হারুনের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমে এই তথ্য হাতে পেয়েছে হাওড়া সিটি পুলিশ। জানা গিয়েছে, এক প্রোমোটারের ‘মাসলম্যান’ হিসাবে কাজ করতে গিয়েই অপরাধ জগতে তার হাতখড়ি। তারপর সালকিয়ার ধর্মতলা এলাকায় এক কুখ্যাত দুষ্কৃতীর হাতে পড়ে হারুন অন্ধকার জগতের বাদশা হয়ে ওঠে বলে জেনেছেন তদন্তকারীরা।
বুধবার কাকভোরে একদা সঙ্গীর হাতেই খুন হয় প্রোমোটার শফিক। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তার শরীর। এই ঘটনায় অভিযুক্ত হারুন ও তার সঙ্গী রাফাকাত হোসেন ওরফে রোহিত পলাতক। তদন্ত নেমে পুলিশ জেনেছে, হারুনের বাবা ছিল আফগান নাগরিক। সুদে টাকা ধার দেওয়ার কারবার করতেন তিনি। পিলখানায় থাকাকালীন এক দালালকে ধরে প্রথমে ভোটার, আধার ও প্যান কার্ড তৈরি করেছিলেন তিনি। এরপর ছেলে জাল ভারতীয় নথি তৈরি করে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শাসকদলে নাম লেখানোর পর স্থানীয় বিধায়কের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে হারুন। এমনকি, দলে পদও পেয়ে যায়। শুরুতে আফগান নাগরিকদের ভুয়ো নথি তৈরির কাজ করত সে। এরপর এক প্রোমাটারের হাত ধরে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই পর্বেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় শফিকের। এই প্রোমোটারের মাধ্যমেই তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল সালকিয়ার ধর্মতলার বাসিন্দা এক কুখ্যাত দুষ্কৃতীর। তারপর তার জীবন বদলে যায়।
পুলিশ জেনেছে, শফিক ও হারুন যৌথভাবে এলাকায় বেআইনি নির্মাণ, তোলাবাজি, আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ভয় দেখানো, অপহরণ করে টাকা আদায় শুরু করে। একাধিক মামলায় হারুনকে গ্রেপ্তার করে গোলাবাড়ি থানা। পরে সে আদালত থেকে জামিন পেয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের অনুমতি ছাড়া পিলখানায় প্রোমোটিং বা বাড়ি তৈরি করা সম্ভব ছিল না। ওই এলাকায় কোনও প্রোমোটার বহুতল নির্মাণ করলে মোটা টাকা তোলা নিত দু’জনে। এমনকি, ইট, বালি সহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী কিনতে হত তাদের থেকে। কেউ টাকা দিতে না চাইলে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে কিংবা অপহরণ করে তারা টাকা আদায় করত বলে অভিযোগ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এভাবে কিছুদিন চলার পর শফিক ও হারুনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। নিজেই দল তৈরি করে হারুন। খুনে অভিযুক্ত অস্ত্র ব্যবসায়ী রোহিতকে দলে নেয় সে। রোহিত তার ‘বডিগার্ড’ হিসেবে কাজ শুরু করে। নিজের এলাকা ছাড়াও ওড়িয়াপাড়া, নন্দীবাগান, সালকিয়া, ঘুষুড়ি, ভোটবাগান সহ একাধিক জায়গায় প্রোমোটিংয়ের কাজ শুরু করে হারুন। সেইসঙ্গে এই সমস্ত এলাকায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার জমিও দখল করতে থাকে। উত্তর হাওড়ার এই অংশে আবার ধর্মতলার ওই কুখ্যাত দুষ্কৃতীর একচ্ছত্র দাপট রয়েছে। হারুন সেখানে ঢুকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এ নিয়ে তার সঙ্গে গোলমাল শুরু হয়। কুখ্যাত দুষ্কৃতীর ‘ডান হাত’ বলে পরিচিত শফিক সরাসরি হারুনের সঙ্গে লড়াইয়ে নামে। একে অপরের শত্রু হয়ে ওঠে। তদন্তে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি একটি জমি নিয়ে শফিক ও হারুনের মধ্যে ঝামেলা হয়। একে অপরকে হুমকি দেয়। তারপর থেকেই শফিককে টার্গেট করেছিল হারুন। অভিযুক্তকে মঙ্গলবার রাতে খুঁজতে গিয়েছিল শফিক। এই খবর হারুনের কাছে পৌঁছালে বুধবার ভোরেই প্রতিপক্ষকে খতম করে দেয় সে।