• বাঘের ভূত ঘাড়ে চেপেছে বেতালের মতো, ছুটি নিয়ে র‌য়্যাল বেঙ্গল আঁকেন শ্রমিক সুনু
    বর্তমান | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সুকান্ত বসু, কলকাতা: সহজ পাঠে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘বনে থাকে বাঘ...।’ কলকাতার কেউ কেউ বলেন, ‘সুনু গুপ্তার মনে থাকে বাঘ।’

    সপ্তাহে চারদিন মাথায় ইট বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেন পেশায় শ্রমিক সুনু। বাকি তিনদিন কাজ করেন না। তার কারণ, ছবি আঁকতে বেরন। কিসের ছবি? বাঘের ছবি! আশ্চর্য যে, তিনি শুধু বাঘের ছবিই আঁকেন। বছরের পর বছর ধরে বাঘ বা চিতার ছবিই এঁকে চলেছেন অক্লান্তভাবে। শখটি একটু অদ্ভুত। তবে অদ্ভুত শখটিরই পরিচর্যা করে চলেছেন ৪০ বছরের মানুষটি।

    সুনুর কানে গোঁজা পেন। হাতে সাদা খাতা। মনে বাঘ। যে কলকাতায় বাঘের চিহ্নমাত্র কোথাও নেই, সেই কলকাতায় কোনও একটি নির্জন গাছের নীচে বসেন। বসে বসে সারাদিন কল্পনার রঙে পেন্সিল ডুবিয়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আঁকেন। সন্ধ্যা গড়ালে বাড়ি ফেরেন, খাতা ভর্তি বাঘ নিয়ে।

    যামিনী রায়ের আঁকা বাঘের ছবিগুলি বা সহজ পাঠে থাকা নন্দলাল বসুর আঁকা বাঘের ছবির কোনও দাম হয় না, প্রায় অমূল্য। একশো কুড়ি-তিরিশ বছর আগে হেনরি রুশো’র আঁকা বাঘের ছবিটির জন্য ব্ল্যাঙ্ক চেক দিতেও রাজি সংগ্রাহকরা। এই বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে চিত্রকর সুনুর কোনও তুলনা হয় না। তবুও জানতে ইচ্ছে করে সুনু গুপ্তা কি বাঘ এঁকে দাম পান? তাঁকে গাছের নীচে একাকী বসে আঁকতে দেখলে পথচলতি কেউ কেউ আগ্রহী হন। কৌতূহলে কাছে যান। তারপর তাঁদের মধ্যে কেউ দু-দশ টাকা উপহার দেন। এটকুই যা বাড়তি রোজগার শ্রমিক মানুষটির। এসব নিয়েই সুনু গুপ্তা শ্রমিক ও শিল্পী।

    তাঁর রোজনামচা অনেকটা এরকম, সপ্তাহে তিনদিন সকালে স্নান করে জলখাবার খেয়ে বেরন। উত্তর কলকাতায় কোনো এক জায়গায় গাছ বেছে বসেন। একের পর এক বাঘ আঁকেন। সে ব্যাঘ্রের নানা ভঙ্গি। নানা মুড। কখনও হিংস্র, কখনও আয়েসি, কখনও শ্বদন্ত ব্যদান করে, কখনও তার ক্রুর চোখ। নিজের আঁকা নিজের পছন্দ হলে আনন্দে চিকচিক করে সুনুর চোখ।

    তাঁর সঙ্গে দেখা এক দুপুরে। উত্তর কলকাতায় এভি স্কুল ছাড়িয়ে খানিক গেলে রাস্তার মাঝ মধ্যিখানে পড়ে লালমন্দির। তার উল্টোদিকের ফুটপাতে বসে আছেন সুনু। এদিন তাঁর ছবির বিষয় বসে থাকা বাঘ। পেন্সিলে শেড দিচ্ছিলেন। পাকা হাত। বললেন, ‘ছোটতে সার্কাস দেখাতে নিয়ে যেত। আমি খালি দেখতাম বাঘ। বহু-বহুবার চিড়িয়াখানায় গিয়েছি। সব ছেড়ে শুধু বাঘ দেখতাম। তার কেরামতিগুলো দেখতাম ভালো করে। তখন থেকেই বাঘের ভূত মাথায়।’ তারপর বললেন, ‘ছবি আঁকার সময় বের করতেই মজুরের কাজ বেছেছি। কত বাঘ যে এঁকেছি কোনও হিসেব নেই।’
    এতশত ছবি নিয়ে কী করবেন? প্রদর্শনী করবেন? হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন খানিক্ষণ। ‘একজন শ্রমিক কি প্রদর্শনী করতে পারে! এ দেশে তা কি আদৌ সম্ভব?’ ফ্যাকাসে হাসি শিল্পী-শ্রমিক সুনুর ঠোঁটে।
  • Link to this news (বর্তমান)