নজিরবিহীন ভাবে রাজ্য পুলিশের হয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চাইতে হল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি পীযূষ পাণ্ডেকে। সুপ্রিম কোর্টে তাঁর ব্যাখ্যা, এত দিন পশ্চিমবঙ্গে সংগঠিত অপরাধের তদন্ত ও এই সব অপরাধের মামলার উপরে নজরদারির জন্য রাজ্য পুলিশের কোনও নিয়মনীতিই ছিল না।
দাগি অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও ‘আড়িয়াদহ তথা কামারহাটির ত্রাস’ বলে পরিচিত জয়ন্ত সিংহ (যে এলাকায় জায়ান্ট নামে পরিচিত) কলকাতা হাই কোর্টে জামিন পেয়ে গিয়েছিল। তার পরেও রাজ্য পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করেনি। হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তোপের মুখে আজ রাজ্য পুলিশের প্রধান যুক্তি দিলেন, পশ্চিমবঙ্গে সংগঠিত অপরাধের তদন্ত, তার মামলার উপরে নজরদারি, দ্রুত অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করা নিয়ে এত দিন রাজ্য পুলিশের কোনও নিয়মনীতি বা এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর) ছিল না। তাই গাফিলতি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের তোপের পরে সম্প্রতি রাজ্য পুলিশ সংগঠিত অপরাধের মোকাবিলায় তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চালানোর ক্ষেত্রে নিয়মনীতি তৈরি করেছে বলে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত ডিজি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘এই ঘটনায় বেলঘরিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ও দক্ষিণেশ্বর থানার ওসি-কে ‘শো-কজ়’ করা হয়েছে। হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশ ১৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছে।’’
গত বছর জুলাইয়ে আড়িয়াদহে জয়ন্ত সিংহ ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে এক স্থানীয় মহিলা ও তাঁর ছেলেকে রাস্তায় ফেলে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। দক্ষিণেশ্বর থানায় জয়ন্তের বিরুদ্ধে ‘অর্গানাইজ়ড ক্রাইম’ বা সংগঠিত অপরাধের মামলা দায়ের হয়। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অক্টোবরে হাই কোর্ট তার জামিন মঞ্জুর করে। জয়ন্তের জামিনের বিরোধিতা করে নিগৃহীত অরিত্র ঘোষ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন। অথচ রাজ্য পুলিশ হাত গুটিয়ে বসেছিল।
অরিত্রের আইনজীবী শাম্ব নন্দী বলেন, ‘‘আজ রাজ্য পুলিশের ডিজি হলফনামা দিয়ে দুঃখপ্রকাশ, এসওপি, শো-কজ়ের কথা বললেও আজ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা বলেছেন, রাজ্য পুলিশ এখন পিঠ বাঁচানোর জন্য এ সব এসওপি, শো-কজ়ের যুক্তি দিচ্ছে। হাই কোর্ট গত অক্টোবরে জামিন দিয়েছে। রাজ্য পুলিশ ফেব্রুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে।’’
সুপ্রিম কোর্ট গত নভেম্বরেই প্রশ্ন তুলেছিল, ‘গ্যাংস্টার’ জয়ন্তের বিরুদ্ধে পুলিশের খাতায় ১৭টি মামলা রয়েছে। তার পরেও তার জামিনের বিরুদ্ধে পুলিশ পদক্ষেপ করেনি কেন? এ নিয়ে রাজ্য পুলিশকে ভিডিয়ো কনফারেন্সে শুনানিতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেছিল বিচারপতি রাজেশ বিন্দলের বেঞ্চ। ফেব্রুয়ারির শুনানিতে পীযূষ পাণ্ডে সুপ্রিম কোর্টে জানান, তিনি সবে দায়িত্ব নিয়েছেন। গোটা বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যাখ্যা দেবেন।
সেই অনুযায়ীই এ বার পীযূষ জানিয়েছেন, হাই কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ না জানানো মূলত প্রক্রিয়াগত ভুল, ইচ্ছাকৃত দায়িত্বের অবহেলা নয়। সে জন্য তিনি ‘নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা’ করছেন। হাই কোর্ট বলেছিল, ব্যারাকপুর কমিশনারেট এলাকায় অভিযুক্ত যেতে পারবে না। সেটাই যথেষ্ট বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তা ছাড়া অভিযুক্ত অন্য মামলায় জেলে ছিল। তাই জামিনের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি। কিন্তু এ ধরনের অপরাধের মামলায় সেই বিবেচনা ঠিক নয়। তাই রাজ্য পুলিশ এই ‘প্রাতিষ্ঠানিক খামতি’-র জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাইছে। সংগঠিত অপরাধের এসওপি না থাকায় দায়িত্ব, সময়সীমা, নজরদারি নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। ভবিষ্যতে ভুলের পুনরাবৃত্তি রুখতে দু’সপ্তাহ আগে তৈরি এসওপি-ও সুপ্রিম কোর্টে জমা দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত ডিজি। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ১৭ মার্চ ফের শুনানি হবে। ডিজি-কে ভিডিয়ো কনফারেন্সে শুনানিতে হাজির থাকতে হবে।