রাজ্যসভায় রাজীব কুমার! সঙ্গে বাবুল, কোয়েল এবং মেনকা গুরুস্বামী, সংসদের উচ্চকক্ষের প্রার্থীতে আবার চমক মমতার
আনন্দবাজার | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজ্যসভা নির্বাচনে প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করে দিল তৃণমূল। শুক্রবার রাতে তৃণমূলের তরফে জানানো হল, রাজ্য পুলিশের সদ্য প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমারকে রাজ্যসভায় পাঠানো হচ্ছে। শুধু রাজীব নন, রাজ্যসভায় প্রার্থী করা হয়েছে রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে। এ ছাড়াও, অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল।
গত মেয়াদে রাজ্যসভার যে কয়েকটি আসন ফাঁকা হয়েছিল, তখন দেখা গিয়েছিল, আলিপুরদুয়ারের প্রকাশ চিক বরাইক, সামিরুল ইসলাম, সাগরিকা ঘোষকে মনোনীত করেছেন মমতা। সেই সময় তৃণমূলের অনেকেই সামিরুল আর প্রকাশকে চিনতেন না। ফলে এই দু’টি নাম তৃণমূল তো বটেই সার্ভিক ভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে চমক তৈরি করেছিল।
আগামী ১৬ মার্চ রাজ্যসভা নির্বাচন। দেশের ১০টি রাজ্যের মোট ৩৭টি রাজ্যসভা আসনে ভোট হবে। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি আসনও রয়েছে। বিধায়কদের সংখ্যার নিরিখে চারটি আসনে তৃণমূল এবং একটিতে বিজেপির জয় নিশ্চিত।
কয়েক দিন আগেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন রাজীব। সেই পর্ব থেকেই রাজ্যসভায় রাজীবের যাওয়া নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল শাসকদলের অন্দরে। অনেকের বক্তব্য, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে গেলে নেপথ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জোর প্রয়োজন হয়। রাজ্য সরকার ও শাসকদলের সেই জোর নিয়ে রাজীব মামলাটি করেছেন বলে অভিমত অনেকের। সুকান্ত লোকসভার সাংসদ। রাজীব যাচ্ছেন সংসদের উচ্চকক্ষে। ফলে লড়াই হবে সেয়ানে-সেয়ানে।
বাবুল যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বালিগঞ্জে দাঁড়াচ্ছেন না, তা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁকে কোথায় দাঁড় করানো হবে তা নিয়ে নানাবিধ মত ছিল শাসকদলের অন্দরে। তৃণমূল সূত্রে খবর, বাবুলকে প্রথমে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য। কিন্তু বাবুল তাতে মৃদু অনুযোগ জানিয়েছিলেন বলে খবর। তা ছাড়া বাবুল আগামী কয়েক বছর নিজের সঙ্গীতের কাজকর্মে মনোনিবেশ করতে চান। ফলে বিধানসভায় তাঁকে দাঁড় করালে রাজ্যে মন্ত্রী করতে হত। কারণ মন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাজের প্রশংসা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। আবার মন্ত্রী হলে গান-বাজনায় সে ভাবে মন দিতে পারা বাবুলের পক্ষে মুশকিল হত। কিন্তু রাজ্যসভায় বাবুলকে পাঠানোয় তাঁর রাজনৈতিক মর্যাদা এবং আনুষঙ্গিক কাজ সবই বজায় থাকবে।
অভিনেত্রী কোয়েলকে মমতা বরাবরই স্নেহ করেন। রাজ্য সরকারের ১৫ বছরের কাজের খতিয়ান উন্নয়নের পাঁচালি দিতে এ বার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়েছিলেন রঞ্জিক মল্লিকের বাড়িতে। প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত আবার অভিষেকের প্রশংসা করেছিলেন। কোয়েলের স্বামী তথা প্রযোজক নিসপাল সিংহ রানেও মমতার ঘনিষ্ঠে বৃত্তে থাকেন। সে দিক থেকে কোয়েলের রাজ্যসভায় মনোনয়ন সেই অর্থে চমক নয়। তবে মমতা ফের একবার বোঝালেন তিনি রাজ্যের চলচ্চিত্র জগৎকে কী চোখে দেখেন। এর আগে কম অভিনেতা-অভিনেত্রীকে সাংসদ, বিধায়ক করেননি মমতা। সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনেও জুন মালিয়া, সায়নী ঘোষেরা জিতে সাংসদ হয়েছেন। দেব, শতাব্দী রায়রা তো রয়েছেনই। সেই তালিকাতেই সংযোজিত হল কোয়েলের নাম।
মানেকা গুরুস্বামী সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে মামলা করেছিলেন ২০১৬ সালে। এলজিবিটি কিউ প্লাসদের অধিকারকে শেষ পর্যন্ত মান্যতা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তা ছাড়া আইপ্যাক মামলায় মমতার আইনজীবী হয়েও সওয়াল করেছেন তিনি। এ বার তাঁকেও সংসদের উচ্চকক্ষে পাঠালেন তৃণমূলের সর্বময়নেত্রী।
মানেকা ঘোষিত সমকামী। তিনি এবং অরুন্ধতি কাটজু ‘পার্টনার’। এ হেন আইনজীবীকে রাজ্যসভায় পাঠানো মমতা তথা তৃণমূলের তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল। কয়েক মাস আগে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুই সমকামী তরুণী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। অচলায়তন ভাঙার জন্য সেই সমকামী দম্পতিকে সংবর্ধনা দিতে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন মথুরাপুরের তৃণমূল সাংসদ বাপি হালদার। সেই অনুষ্ঠানে ফোন করে সমকামী দম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন অভিষেক। মানেকাকে রাজ্যসভায় প্রার্থীর করার সিদ্ধান্তকে সেই ধারাবাহিগতার অংশ হিসাবে দেখছেন অনেকে।
এই চারটি আসনে তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন সুব্রত বক্সী, মৌসম বেনজির নূর, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাকেত গোখলে। বয়স এবং শারীরিক কারণে বক্সী নিজেই আর রাজ্যসভায় যেতে চান না বলে দলকে জানিয়েছিলেন। মৌসম সাংসদপদ থেকে ইস্তফা দিয়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ঋতব্রতকে বিধানসভায় প্রার্থী করার পরিকল্পনা রয়েছে শাসকদলের। সেই অর্থে বাদ পড়লেন সাকেত।