গত বছরের চেয়ে আলু চাষ কম হয়েছে। কিন্তু ফলন আশাতীত হবে বলেই জানাচ্ছে উপগ্রহ-চিত্রের রিপোর্ট। কৃষি দফতর ও কৃষি বিপণন দফতরের কর্তারা আগেই ভেবেছিলেন, চাষিদের কাছ থেকে কম দামে আলু কিনবেন বিনিয়োগকারীরা। জলদি আলু ওঠার সময় থেকেই তাঁদের ভাবনা মিলেও যায়। তাই ভোটের বাজারে জ্যোতি আলু ওঠার ঠিক আগে সাড়ে ন’টাকা কেজিতে আলু কেনার কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। তবে চাষি থেকে বিনিয়োগকারীদের একটা বড় অংশের দাবি, সরকার মাঠের সব ফলন কিনবে না। আবার বাছাই করা আলু কিনবে। তাতে লাভ নয়, হয়রানি বাড়বে।
পূর্ব বর্ধমানে ৭২ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়। ফলন হয় ১ কোটি ২৮ লক্ষ টনের মতো। এ বছর আলু চাষের এলাকা কমে হয়েছে ৬৯ হাজার হেক্টর। আর ফলন হওয়ার আশা রয়েছে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ কুইন্টাল অর্থাৎ ২ কোটি ৯০ লক্ষ বস্তা (৫০ কেজির বস্তা)। বৃহস্পতিবার মন্ত্রীসভার বৈঠকের পরে রাজ্যের কৃষি উপদেষ্টা তথা পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার জানান, মার্চের গোড়ায় বাজার থেকে গুণগত মান যাচাই করে সহায়ক মূল্যে আলু কেনার ব্যবস্থা করা হবে। হিমঘরের সামনে এক-একজন কৃষক ৩৫ কুইন্টাল অর্থাৎ ৭০ বস্তা আলু বিক্রি করতে পারবেন। জুন মাসের পরে সেই আলু বিক্রি করা শুরু হবে।
চাষিদের একটা অংশের দাবি, সরকার সব আলু কিনবে না। যা কিনবে, তাও বাছাই করা আলু। বাকি আলু সেই ব্যবসায়ীদেরই বিক্রি করতে হবে। অর্থাৎ ব্যবসায়ী বা ফড়েদের হাত থেকে নিস্তার নেই। জামালপুরের প্রবীণ চাষি শ্যামাপদ আদুরে, মেমারির মজিদ রহমানদের দাবি, “এক বিঘা জমিতে জ্যোতি আলু চাষের খরচ ২৭-৩০ হাজার টাকা। ফলনের সময় ভাল, মাঝারি, খারাপ, ক্যাট–সব রকম আলুই থাকে। গড়ে সাড়ে ১০ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি করতে না পারলে লাভ হবে না।” মেমারি ২ ব্লকের কার্তিক মুর্মু, আদিত্য মাঝিদের দাবি, “শুক্রবার খেত থেকে গড় আলু ২৮০ টাকা বস্তায় বিক্রি হয়েছে। হিমঘর পর্যন্ত নিয়ে যেতে আরও ৫০ টাকা খরচ। সেই দিক দিয়ে দেখলে চাষির লাভই হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগটা ভাল।” তবে সব আলু সরকার না নিলে যে চাষির যে লাভ হবে না, সেটাও তাঁরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
মেমারি ১ ব্লকের চাষি প্রদ্যুৎ ঘোষ, অরূপ ঘোষ কিংবা জামালপুরের চাষি প্রসেনজিৎ পালদের কথায়, “সরকার সব আলু কিনে নিলে আমাদের কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত না। তাতে কিছুটা লাভ হত।” সহায়ক মূল্যে আলু কেনা যে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে এখনই সম্ভব নয়, তা মেনে নিচ্ছেন প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্যের সভাপতি তথা জেলা সম্পাদক জগবন্ধু মণ্ডল। তাঁর কথায়, “এ রাজ্যের আলুর চাহিদা ভিন রাজ্যে কমে গিয়েছে। পাশ্ববর্তী রাজ্যগুলি আলু চাষ করছে। বিক্রি করার জায়গা না থাকলে বিনিয়োগকারীরা আলু কিনবেন না।’’
কৃষকসভার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বিনোদ ঘোষ বলেন, “সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করলে চাষিদের লোকসান হবে। ভোটের আগে কৃষকদের ভুল বোঝানো হচ্ছে। বাকি আলু কী ভাবে কৃষক বিক্রি করবেন, সে নিয়ও সরকারের মাথাব্যথা নেই।” মেমারির বিজেপির আহ্বায়ক শৈলেন বিশ্বাস বলেন, “আমিও আলু চাষি। ভোটের আগে আলু কিনে চাষিদের নয়, তৃণমূলের উপকার হবে।” যদিও কৃষি কর্মাধ্যক্ষ মেহেবুব মণ্ডল বলেন, “সরকারের এই দূরদৃষ্টির জন্য চাষিরা লাভবান হবে। অভাবী বিক্রি বন্ধ হবে।’’