কমবেশি তিন মাসের মাথায় গোটা দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে ভূমিকম্পে আবার দুলে উঠল নদিয়া। শুক্রবার দুপুর ১.২২ মিনিট নাগাদ কয়েক সেকেন্ডের জন্য কলকাতা-সহ অন্য জায়গার সঙ্গে কেঁপে ওঠে প্রায় গোটা জেলা। এর আগে গত ২১ নভেম্বর, ১০টা নাগাদ ভূমিকম্পে কেঁপেছিল নদিয়া। ঘটনাচক্রে সে দিনও ছিল শুক্রবার। তবে এ দিনের কম্পনের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি।
শুক্রবার নবদ্বীপ, কৃষ্ণনগর, চাকদহ, শিমুরালি থেকে তেহট্ট, করিমপুর প্রভৃতি জায়গার বাসিন্দারা জানিয়েছেন তাঁরা স্পষ্ট অনুভব করেছেন ভূমিকম্পের তীব্রতা। পাশাপাশি অনেকেই বুঝতে পারেননি ভূমিকম্প হয়েছে। বুঝতে পেরে অনেকে ঘর থেকে ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে আসেন। প্রাথমিক অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার পরে সমাজমাধ্যম থেকে রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান সর্বত্র শুরু হয় ভূমিকম্প নিয়ে চর্চা।
শিমুরালির বাসিন্দা সরস্বতী বিশ্বাস বলেন, “আমি ভূমিকম্প হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা করি তাঁরা বুঝতে পেরেছেন কিনা। অনেকেই বুঝতে পারেননি। কেউ বলেছেন পরে বুঝতে পেরেছেন যে ভূমিকম্প হল।” একই ভাবে দেবাশিস ঘোষ বলেন, “সেই সময় আমার ঘরের খাট জোরে নড়ে ওঠায় বুঝতে পারি কি ঘটেছে।” গাংনাপুরের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বাড়ি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টেবিল, চেয়ার নড়ে উঠতে দেখেন অনেকেই। দেবগ্রামের তালপাড়ার বিপ্লব দাস চৌধুরী বলেন, “ভূমিকম্পের কারণে ঘরের দেওয়াল পড়ে যায় অনেক সময়। সেই সময় ভয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলাম।”
করিমপুর এলাকার বেশির ভাগ মানুষের বক্তব্য, ভূমিকম্প হয়েছে ঠিকই তবে খুব স্বল্প সময়ের জন্য হওয়ায় অনেকেই তা অনুভব করতে পারেননি। এলাকায় ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি। তবে ভূমিকম্প হচ্ছে বুঝতে পারেন তেহট্টের বিভিন্ন অংশের বাসিন্দারা। কুন্তল বৈরাগ্য নামে এক যুবক বলেন, “বাড়িতেই শুয়ে ছিলাম, হঠাৎ বৈদ্যুতিক পাখা দুলতে শুরু করে। তখন ভূমিকম্প হচ্ছে বুঝেই বাইরে বেরিয়ে যাই।”
বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন শুক্রবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্থল ছিল বাংলাদেশের সাতক্ষীরা। বঙ্গ বেসিনের দক্ষিণ অংশে মূলত বাংলাদেশের ‘ইয়োসিন হিঞ্জ লাইনের’ কাছাকাছি দুপুর ১.২২ মিনিটে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৫ এবং গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার।
এ দিনের ভূকম্পের প্রাথমিক কারণ প্রসঙ্গে ভূগোলের শিক্ষক জ্যোতির্ময় চক্রবর্তীর ব্যাখ্যা, ‘ফরিদপুর ট্রাফ’ একটি দীর্ঘ ও নিচু ভূখণ্ড। যার এক দিকে, ‘বরিশাল গ্র্যাভিটি হাই’ এবং অন্য দিকে, হিঞ্জ অঞ্চলের অর্ধেক বিস্তৃত। তিনি বলেন, “ভূতত্ত্বে ট্রাফ বলতে এমন অবনমিত অঞ্চলকে বোঝায় যেখানে ভূমি ক্রমশ এক দিকে বসে যায়। এই অঞ্চলে ভূমিকম্প হওয়ার প্রধান কারণ ভূ-ত্বকের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পলিরাশি।”
তাঁর ব্যাখ্যায়, ওই অঞ্চলে ‘ইন্ডিয়ান প্লেট’ ও ‘ইন্দো-বার্মা প্লেট’ পরস্পরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেএবং একে অপরকে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। ফলে মাটির নিচে প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ করে দুর্বল ভাঙন রেখা বরাবর যখন মুক্তি পায় তখন এই এলাকায় ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। তাছাড়াএই এলাকায় পুরু ও নরম পলিস্তর থাকার ফলে কম্পনের প্রভাব বেড়ে যায়। তাই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও এখানে তুলনামূলক জোরালো ভাবে অনুভূত হয়।