২০০০ সালের আশপাশে যাঁরা মাধ্যমিক পাশ করেছেন, তাঁরা জানেন বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য কত পরিশ্রম করতে হত। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে আত্মীয় বন্ধুরা সকলেই পড়ুয়ার দিকে একবার আড় চোখে দেখে নিতেন— বিজ্ঞান পড়তে না গেলে যেন জীবনই বৃথা!
গত দেড় দশকে আমূল বদলে গিয়েছে শিক্ষার চালচিত্র। ২০২৬-এ এসে বিজ্ঞ়ান পড়ুয়া খুঁজে নিয়ে আসতে হচ্ছে স্কুলগুলিকে। দশম উত্তীর্ণ পড়ুয়ারা নাকি আর রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা বা গণিত-রাশিবিজ্ঞানে তেমন আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছে না।
২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বিজ্ঞান দিবস। কলকাতা শহরের ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’-এর গবেষণাগারে ‘রমন এফেক্ট’ আবিষ্কারের জন্য প্রায় ৯৬ বছর আগে এ দিনেই সিভি রমন পেয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার। এই বাংলা এক সময় ছিল জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুলচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানীদের কর্মস্থল। সেখানেই নাকি বিজ্ঞানে অনাগ্রহ।
কিন্তু কেন এমন অবস্থা ?
এ জন্য অবশ্য শিক্ষার মানের অবনমন, চাকরির ক্ষেত্রে অন্য বিষয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়াকে দায়ী করছেন অনেকে। বহু ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় পরিকাঠামোর অভাবও দায়ী বলে মনে করা হয়। হাতে গোনা কয়েকটি প্রথম সারির কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যত্র শিক্ষা ও উপযুক্ত গবেষণাগারের অভাব রয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের প্রবীণ শিক্ষক শ্যামল চক্রবর্তী বলেন, “আসলে শিক্ষাটাই এখন পণ্য হয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞান যদি বাজারজাত না হয় অর্থাৎ যদি সেই বিষয় পরে সরাসরি চাকরি না হয় তাহলে সেটা পরে আর লাভ নেই, এই প্রবণতার কারণে চাহিদা কমছে বলে।” পরিস্থিতিও সে দিকেই। বৃত্তিমূলক বিষয়গুলির চাহিদাই বেশি।
অন্য এক শিক্ষক বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। বেশির ভাগ পড়ুয়াই পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা করে ‘ল্যাটারাল এন্ট্রি’ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক কোর্স করে নিচ্ছে। এর ফলেও ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়তে আগ্রহী পড়ুয়ারাও বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চাইছে না। কিন্তু সেই ডিপ্লোমাতেও বেসিক সায়েন্স পড়তেই হচ্ছে।
কী ভাবছে শিক্ষা দফতর?
রাজ্য শিক্ষা দফতর সূত্রের খবর, মাধ্যমিকের পর বিজ্ঞান শাখায় ভর্তির প্রবণতা এখন তলানিতে। কিন্তু এই প্রবণতা কমাতে চাইছে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। স্কুল পড়ুয়াদের বিজ্ঞানমুখী করার আগামী এপ্রিলের প্রথম দু’সপ্তাহে অনলাইনে ‘বুটস্ট্র্যাপ ক্যাম্প’ করাতে চাইছেন কর্তৃপক্ষ। এ বছরে সরকারি এবং সরকারপোষিত স্কুলগুলিতে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হবে।
সংসদ সূত্রের খবর, ২০২১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়েছিল। বহু স্কুলে বিজ্ঞান শাখার আসন শূন্য থেকে যায়। ২০২১ নাগাদ সংসদের সভাপতি দায়িত্ব নিয়েছিলেন চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। তিনি জানান, সেই সময়ই ঠিক হয়েছিল, বিজ্ঞানে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ বৃদ্ধি করতে পদক্ষেপ করা হবে। চলতি বছর অনলাইনে পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বিজ্ঞানের গুরুত্ব এবং আগামী দিনে বিজ্ঞান প্রযুক্তি কেন প্রয়োজন এবং বিশেষ করে কেরিয়ার গঠনের ক্ষেত্রেও যে বিজ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেই বিষয়ে পথ দেওয়া হবে।
কী ভাবে হবে এই ক্যাম্প?
চিরঞ্জীব জানান, সব স্কুলের তথ্যই তাঁদের কাছে রয়েছে। সেখানে গোটা রাজ্যে বিভিন্ন স্কুলের সঙ্গে কথা হয়েছে। কোন পড়ুয়া বিজ্ঞান নিয়ে আগামী দিনে এগিয়ে যেতে পারে তার একটি ক্রমতালিকা স্কুলগুলিকে প্রস্তুত করতে বলা হয়েছিল। স্কুলগুলিই এই অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে সাহায্য করবে পড়ুয়াদের। সংসদ একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানমুখী করে তোলার চেষ্টা করবে বলে জানান সভাপতি। চিরঞ্জীববাবু জানান , ২০২১ থেকে ৯ শতংশ থেকে ২০২৫ সালে বিজ্ঞানে পড়ুয়া ভর্তির হার ১৪ শতাংশে নিয়ে যাওয়া গিয়েছে। আগামী দিনে সেটা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা তাঁর।
যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য বলেন, “ছাত্রছাত্রীরা খুবই কম বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছে। এটা খুবই ভয়ঙ্কর। সংসদের এই উদ্যোগ সাধুবাদ যোগ্য। আমার মনে হয় বিজ্ঞানকে ক্লাস রুমে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তাদের হাতে কলমে বিজ্ঞান শেখাতে হবে. যেন তারা আগ্রহী হয়।”