• ৪০ শতাংশ স্কুলে নেই প্রধানশিক্ষক, ইচ্ছেমতো ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করে চলছে দুর্নীতি, অভিযোগ
    আনন্দবাজার | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • গত পাঁচ বছরে রাজ্যের স্কুলগুলিতে প্রধানশিক্ষক নিয়োগ হয়নি। অথচ, নিয়ম মেনে বহু স্কুলের প্রধানশিক্ষক অবসর নিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ চালাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা। কিন্তু সেখানেও উঠছে অনিয়মের অভিযোগ। শিক্ষকদের একাংশই অভিযোগ তুলছেন, শাসকদলের হাতের পুতুল হয়ে রয়েছেন ওই ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা।

    সূত্রের খবর, রাজ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার স্কুলের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষকের হাতে। ফলে অনেক কাজ যেমন আটকে থাকছে, তেমনই বহু ক্ষেত্রে স্কুলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলেও অভিযোগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাসকদলের বশংবদ শিক্ষকদের ওই পদে মনোনীত করা হচ্ছে পরিচালন সমিতির তরফে। গত কয়েক বছরে রাজ্যের প্রায় সব স্কুল পরিচালন সমিতিতেই শাসক তৃণমূলের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়, এ অভিযোগ উঠেছে আগেই। যদিও তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

    শিক্ষা মহল সূত্রের খবর, শেষে বার প্রধানশিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা হয়েছিল ২০১৮ সাল নাগাদ। এর পরে ২০১৯-২০ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পাঁচ-ছ’বছর পেরিয়ে গিয়েছে, ৪০ শতাংশেরও বেশি স্কুলে প্রধানশিক্ষক নেই এখন।

    বিরোধী শিক্ষক সংগঠনগুলির অভিযোগ, প্রধানশিক্ষক নিয়োগ করা হয় নির্দিষ্ট পরীক্ষা এবং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষকদের ক্ষেত্রে চলছে সম্পূর্ণ অন্য ব্যবস্থা। অভিযোগ, স্কুল পরিচালন সমিতির তরফে তাদের পছন্দের কোনও সহকারী শিক্ষককে বেছে নিয়ে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক পদে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রেই কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার দিকে নজর থাকছে না বলে অভিযোগ। শিক্ষকদের একাংশ দাবি করছেন, যোগ্যতার থেকে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে শাসকের প্রতি আনুগত্য।

    নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুজিত দাস বলেন, “আইন অনুযায়ী প্রধানশিক্ষক অবসর নিলে সহ-প্রধান শিক্ষক বা কর্মজীবনের সব থেকে বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক পদে বসানো হয়। কিন্তু আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পরিচালন সমিতি নিজেরদের ইচ্ছা মতো পছন্দের শিক্ষকদের এই পদে বসিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।”

    এর ফলে নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে বলেও দাবি বিরোধী মনোভাবাপন্ন শিক্ষকদের। সরকারি সমস্ত প্রকল্প যেমন, মিড-ডে মিল, সমগ্র শিক্ষা অভিযানের অর্থ কোথায় কী ভাবে খরচ হবে তা সম্পূর্ণ পরিচালন সমিতির বকলমে শাসকদলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষকের দাবি, “প্রধানশিক্ষককে যে সব সময় পরিচালন সমিতি নিজের মতে পরিচালিত করতে পারবে, তা নয়। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ততখানি ক্ষমতাই থাকে না। বিরুদ্ধাচরণ করলে যে কোনও সময় তাঁকে সরিয়ে ফের পছন্দের কাউকে পদে বসিয়ে দিতে পারে পরিচালন সমিতি।”

    এ প্রসঙ্গে বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল, “স্কুলের উন্নয়ন থেকে নানা সরকারি প্রকল্প, সব ক্ষেত্রেই শাসকদল তাদের কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাই করায়ত্ব করে ফেলতে চাইছে তারা। দ্রুত প্রধানশিক্ষক পদে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রয়োজন।”

    যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে শাসকদল। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির রাজ্য সভাপতি প্রীতম হালদার বলেন, “প্রধানশিক্ষক নিয়োগ জরুরি। এ কথা একান্তই সত্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা সকলেই অযোগ্য। কারও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয় থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা তাঁর যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না।”

    কিন্তু কবে হবে প্রধানশিক্ষক নিয়োগ?

    প্রধান শিক্ষক সংগঠন অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেসেস-এর রাজ্য সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতি বলেন, “বহুবার এ সংক্রান্ত ফাইল রাজ্য শিক্ষা দফতরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত ছাড়া ওই কাজ এগোনো সম্ভব নয়। অথচ, অবিলম্বে এই নিয়োগ প্রয়োজন।”

    বিকাশ ভবনের দাবি, নিয়োগের সিদ্ধান্ত একান্তই রাজ্য সরকারের। ফলে তাদের পক্ষ থেকে কিছু করণীয় নেই।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)