• নাম বাদে এগিয়ে ২৪ পরগনা, নজরে ‘বিবেচনাধীন’ও
    আনন্দবাজার | ০১ মার্চ ২০২৬
  • ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) খসড়া তালিকায় যে সংখ্যক নাম বাদ গিয়েছিল, তার তুলনায় শনিবার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে সেই ‘ধাক্কা’ কিছুটা কম বলেই মনে করছে রাজনৈতিক শিবির। তবে এখনও ৬০ লক্ষেরও বেশি নাম বিবেচনাধীন। সেগুলির নিষ্পত্তি কোন পথে এগোয়, সে দিকে নজর রয়েছে সব পক্ষেরই। পাশাপাশি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ভবানীপুরে নাম বাদ যাওয়া নিয়েও শাসক-বিরোধী তরজা বেধেছে।

    চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে এই পর্বে জেলাওয়াড়ি নাম বাদের যে সংখ্যা সামনে এসেছে, তাতে প্রথম পাঁচটি জেলা— উত্তর ২৪ পরগনা (১৪২২৯৭), নদিয়া (প্রায় ৬২ হাজার), জলপাইগুড়ি (৩২৭৮৫), দার্জিলিং (২৩১৮৯) এবং দক্ষিণ দিনাজপুর (২১৮০৩)। পাশাপাশি, বিবেচনাধীনের সংখ্যায় সব থেকে এগিয়ে মুর্শিদাবাদ (১১ লক্ষ)। এ ছাড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও মালদহে সংখ্যাটা যথাক্রমে প্রায় ৮ লক্ষ, প্রায় ৫ লক্ষ ও ৮ লক্ষ ২৮ হাজার। অ-বিজেপি দলগুলি মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিবেচনাধীনের তালিকায় উপরের দিকে থাকা এই জেলাগুলির মধ্যে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের পাশাপাশি দুই ২৪ পরগনাতেও সংখ্যালঘু জনসংখ্যা উল্লেযোগ্য।

    নাম বাদের তালিকায় এগিয়ে রয়েছে কলকাতাও। খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দুই পর্বে চৌরঙ্গি (৭৭২৫৮), জোড়াসাঁকো (৭৪৩৬৮), বালিগঞ্জ (৬৫৬৭৫), কলকাতা বন্দর (৬৪৮০০), কসবার (৫৯২২১) মতো বিভিন্ন কেন্দ্রে নাম বাদ গিয়েছে বড় সংখ্যায়। পাশাপাশি, মানিকতলা, শ্যামপুকুর, এন্টালি-সহ কলকাতার বাকি কেন্দ্রগুলিতেও ‌দুই পর্বে ৪০ হাজারের বেশি নাম বাদ গিয়েছে।

    বিশেষ ভাবে চর্চায় রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ভবানীপুর, বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নন্দীগ্রামের মতো ‘নজরকাড়া’ কেন্দ্রগুলি নিয়েও। এই পর্বে ২৩৪২ জন-সহ মোট ৪৭১১২ জনের নাম বাদ গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী ক্ষেত্র থেকে। নন্দীগ্রামে সেই সংখ্যাটা ১১০০১। উত্তরবঙ্গে উদয়ন গুহের কেন্দ্র দিনহাটা থেকে ওই সংখ্যা ১৬৭৬৩। মতুয়া-অধ্যুষিত বাগদা, বনগাঁ উত্তরেও বড় সংখ্যায় নাম বাদ গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভবানীপুরের নাম বাদ যাওয়াকে সামনে রেখে সরব হয়েছেন বিরোধী নেতা শুভেন্দু। তিনি বলেছেন, “ভবানীপুরে এখনও বিবেচনাধীন রয়েছেন ১৪৫১৪ জন। ওঁকে জেতানোর মতো ভোটার ভবানীপুরে নেই।” আর সামগ্রিক ভাবে তাঁর প্রতিক্রিয়া, “প্রথম দফায় ৫৮ লক্ষ এবং অনুপস্থিত ইত্যাদি মিলিয়ে আরও পাঁচ থেকে লক্ষ নাম বাদ। আরও ৬৫ লক্ষ বিবেচনায় রয়েছে।” তাঁর আরও অভিযোগ, “কোচবিহারের তৃণমূল নেতারা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আশ্বস্ত করেছেন, ভোটটা এই বারে দিতে পারবেন না। কিন্তু ভাতা চালু থাকবে।” প্রসঙ্গত, ভবানীপুরে মৃত ভোটারদের জীবিত ও জীবিতদের মৃত হিসাবে দেখানো হয়েছে বলে এ দিনই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককের (সিইও) কাছে অভিযোগ করেছে কংগ্রেস।

    ভবানীপুর নিয়ে বিজেপিকে পাল্টা নিশানা করেছে তৃণমূলও। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের বক্তব্য, “ভবানীপুরে গড়ে ৬৫%-এর মতো ভোট পড়ে। তালিকায় থাকলেও মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটার ভোট দেন না, এটা তাঁরই প্রমাণ। বিজেপি নাচানাচি করলেও ভোটের ফলে তারতম্য হবে না।”

    এরই মধ্যে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ফের বলেছেন, “জাতীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পশ্চিমবঙ্গে আসা দরকার। তিনি দেখে যান, অন্য ১১টি রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির পার্থক্য কোথায়।” যোগ্য ভোটার কেউ বাদ গিয়ে থাকলে, অবশ্যই তাঁরা অন্তর্ভুক্ত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। তবে পুরো বিষয়টিকে সামনে রেখে এ দিনও বিজেপিকে নিশানা করেছে তৃণমূল। দলের নেতা কুণাল বলেছেন, “গোটাটাই বিজেপির চক্রান্ত। মহারাষ্ট্র, দিল্লি, হরিয়ানা, বিহারে যা করেছে, এখানে আরও বড় আকারে করতে চেয়েছে। এখানে মুখ্যমন্ত্রী তা প্রতিহত করতে নেমেছেন। তাতেও এমন কিছু গোলমাল পাকিয়েছে, যাতে বিএলও-রাই হিসাব মেলাতে পারছেন না। মৃত, স্থানান্তরিতদের নাম তো বাদ যাবেই। প্রতি ভোটেই এই ২০% ভোট পড়ে না।” নৈহাটি পুরসভার দলের পুর-প্রতিনিধি সুশান্ত সরকার ও তাঁর মায়ের নাম তালিকায় ‘ডিলিটেড’ বলে দেখানো হয়েছে, এমনটা জানিয়ে কমিশনকে নিশানা করেছে তৃণমূল।

    স্বচ্ছ ভোটার তালিকার দাবিতে অনড় থেকেই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে ফের সরব হয়েছে সিপিএম ও কংগ্রেসও। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, “এসআইআর মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। যাঁদের এই কাজ সুষ্ঠু ভাবে করার কথা ছিল, তাঁরা ব্যর্থ বলেই বিচার বিভাগকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এক দিকে নাম বাদ দেওয়া, অন্য দিকে বিবেচনাধীন করে রাখার মধ্যে মতুয়া অংশের মানুষ, প্রান্তিক গরিব, সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করা হচ্ছে।” প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও বলেছেন, “এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর পরে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিনেও ব্যাপক অব্যবস্থা। এখন নির্বাচন কমিশন বিচার বিভাগের উপরে দোষ চাপাতে চাইছে। কিন্তু আমরা বিচার বিভাগের প্রতি আস্থাশীল।”

    এই পরিস্থিতিতে এসইউসি-র রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তরুণকান্তি নস্করের অভিযোগ, “বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষের মধ্যে অনেককেই একাধিক বার শুনানিতে ডাকা হয়েছে। অথচ, তাঁদের নাম মূল তালিকায় নেই। তাঁরা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।” কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং যোগ্য ভোটারের নাম যাতে বাদ না-পড়ে, সেই দাবি তুলে আগামী কাল, সোমবার সিইও দফতরে বিক্ষোভের কর্মসূচিও নিয়েছে এসইউসি।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)