৬৩ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ, বিচারাধীন আরও ৬০ লাখ, বিজেপির ‘টার্গেট’ পূরণ কমিশনের?
বর্তমান | ০১ মার্চ ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: এসআইআরের খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষ নাম। তারপর আনম্যাপড, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি... আরও নানা জটিলতা সামনে আসে। হস্তক্ষেপ করতে হয় সুপ্রিম কোর্টকেও। শেষপর্যন্ত শীর্ষ আদালতের নির্দেশ মেনে শনিবার পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন। তাতে বাতিল করা হয়েছে আরও ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের তালিকার নিরিখে সব মিলিয়ে বাদের খাতায় ৬৩ লক্ষেরও বেশি ভোটার। তবে উদ্বেগ এখানেই শেষ হচ্ছে না। কমপক্ষে ৬০ লক্ষ ভোটার এখনও ‘বিচারাধীন’ (অ্যাডজুডিকেশন)। তাঁদের ভাগ্য আপাতত ঝুলে রয়েছে বিচারকদের হাতে। আর সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে—বাতিল ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি পেরিয়ে যাবে না তো? বিজেপি নেতাদের দেড় কোটি নাম বাদ দেওয়ার ‘টার্গেট’ কি ঘুরপথে পূরণ করছে কমিশন? এসআইআর পর্বে ‘ফর্ম ৭’-এর অপব্যবহার নিয়ে বারবার অভিযোগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাফ জানিয়েছেন, বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করছে বিজেপি। এমনকি ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারকে বাতিলের খাতায় ফেলা হতে পারে বলে সম্প্রতি আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন। এদিনের প্রকাশিত প্রথম চূড়ান্ত তালিকার গতিপ্রকৃতি সেই আশঙ্কা আরও উসকে দিয়েছে। ফলে পরবর্তী তালিকা না আসা পর্যন্ত কমিশনের কাজের বিরুদ্ধে প্রশ্ন জিইয়ে থাকবে।
এসআইআরের সূচি অনুযায়ী গত ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকায় নাম ছিল ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০ জনের। এদিন প্রকাশ হওয়া প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকা বলছে, রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা এখন ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪। কমিশন আরও জানিয়েছে, এর মধ্যে ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭০৭ জন নতুন ভোটার। এর মধ্যে ‘ফর্ম ৬’ পূরণ করে তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬ জন। বাকিরা ‘ফর্ম ৮’ পূরণ করে তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। তবে এই প্রেক্ষিতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান হল, খসড়া তালিকা থেকেও প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ নাম বাদ যাওয়া। কীসের ভিত্তিতে বা কাদের আপত্তিতে তা করা হল, সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
এসআইআর চলাকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সহ একাধিক রাজনৈতিক দল পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এদিন তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল সেকথা স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেছেন, ‘কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে।’ তবে তাঁর বক্তব্য, এই বিরাট প্রক্রিয়ায় এই ভুল নিতান্তই সামান্য। যাদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের আবার ৬ নম্বর ফর্ম পূরণের সুযোগ থাকছে।
এসআইআর পর্বে লাগাতার বেড়েছে আনম্যাপিং এবং লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির সমস্যা। নথি জমা সত্ত্বেও সন্দেহজনক হিসাবে দেগে দেওয়া এবং বারবার শুনানির লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করার পর্ব পেরিয়ে এদিন যখন দেখা যায় তালিকায় অনেকের নাম নেই, তখনই জেলায় জেলায় বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই সব ‘বাতিল ভোটার’দের দাবি, কমিশন ও বিজেপি চক্রান্ত করে এই কাজ করেছে। অনেক জায়গায় আবার মৃত ব্যক্তির নামও তালিকায় থাকার অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে প্রথম দফার এই চূড়ান্ত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে। এই অবস্থায় ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের নথি নিষ্পত্তি হলে ভবিষ্যতে আরও নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা চরমে।