নথি জোগাড়ের চিন্তা। শুনানি কেন্দ্রে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ধকল। একাধিক বার শুনানিতে ডাক পাওয়ার হয়রানি। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে নভেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া উদ্বেগ কাটল না শনিবারেও। এ দিনও চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম আছে কি না জানার অপেক্ষায় অনেকে রোজের কাজে যেতে পারেননি। তালিকা প্রকাশের পরে কারও নাম বাদ গিয়েছে, কেউ রয়েছেন বিবেচনাধীনের তালিকায়। তাতে বেড়েছে ক্ষোভ। হতাশা। কোথাও কোথাও তার বহিঃপ্রকাশও হয়েছে।
কয়েকশো ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায় আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটার ময়রাডাঙা গ্রাম পঞ্চায়েতে। অভিযোগ, ওই গ্রাম পঞ্চায়েতের চারটি বুথে নাম বাদ ও অ্যাজুডিকেটেড মিলিয়ে প্রায় ছ’শো জন রয়েছেন। এরই প্রতিবাদে সন্ধ্যা থেকে ফালাকাটা থেকে কুঞ্জনগর হয়ে ন’মাইল পর্যন্ত যাওয়া রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু হয়। বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে হয় অবরোধ। সেই সঙ্গে রাস্তায় আগুন জ্বালিয়েও চলে প্রতিবাদ। ফালাকাটা থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশের হস্তক্ষেপে রাত ১০টা নাগাদ অবরোধ ওঠে।
বেলা ১২টা থেকে সংশোধিত ভোটার তালিকা নিয়ে বিএলও ভোটকেন্দ্রে থাকবেন বলে শুনেছিলেন জলপাইগুড়ির দেশবন্ধুনগরের টোটোচালক সুরজিৎ রায়। বিএলও এলেন দুপুর ১টার পরে। তালিকায় নাম না দেখে বিএলও-র কাছে সুরজিৎ জানতে চাইলেন, ‘‘এ বার কী হবে?’’ বিএলও সদুত্তর দিতে পারেননি। সুরজিতের আক্ষেপ, “দু’বার শুনানিতে ডেকেছিল। নানা নথি চাইল। কষ্ট করে জোগাড় করলাম। এখন দেখছি, তালিকায় নাম নেই। দেশে থাকতে সমস্যায় পড়ব না তো!” একই আতঙ্কের শরিক নদিয়ার চাপড়া বিধানসভার সীমান্তবর্তী গ্রাম হাঁটরার আজিমা খাতুন মোল্লা। নাকাশিপাড়ার হরিদ্রাপোতা গ্রামের আজিমা বিবাহসূত্রে হাঁটরায় থাকেন। বাবার পদবি সংক্রান্ত কারণে শুনানিতে ডাক পান। তাঁর নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় আছে। বলছেন, ‘‘এ বারে হয়তো আমাকে এ দেশ থেকেতাড়িয়ে দেবে!’’
বছর পঞ্চাশের সুকুমার পালের আদি বাড়ি ঝাড়গ্রামের লালগড়ের বামালে। তবে তিনি গত ২৫ বছর বিনপুর-১ ব্লকে থাকেন। নিরক্ষর সুকুমারের স্কুলের শংসাপত্র নেই। ঝাড়খণ্ডের টাটায় দিনমজুরি করেন। সুকুমারের ক্ষোভ, ‘‘বাবার জমি বিক্রির কাগজপত্র জমা দিয়েছিলাম। তবু নাম উঠল না! অথচ, এত দিন বিধানসভা ও লোকসভায় ভোট দিয়েছি।’’ হাওড়ার বাগনানের কেন্দ্রীয় সরকারের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী বছর পঁচাত্তরের শেখ আমির আলি বলেন, ‘‘নামের সামান্য ভুলে আমাকে শুনানিতে ডাকা হয়। পেনশন-সহ সব নথি জমা দিলেও নামের পাশে বিচারাধীন ছাপ! আমার উৎকণ্ঠা কাটল না।’’
এসআইআর প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) একাংশও স্তম্ভিত। বীরভূমের দুবরাজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ১৩৯ পার্টের বিএলও অমর মাহাতা জানাচ্ছেন, তাঁর বুথে ২৯ জনের নাম বাদ গিয়েছে। তাঁদের অন্তত ১৮ জনের নথি নিয়ে সমস্যা ছিল না। এমনকি, প্রযুক্তিগত সমস্যার জন্য তথ্য না মেলায় ‘আন ম্যাপড’ ভোটারের গোত্রভুক্ত হয়ে যাঁরা শুনানিতে হাজির হয়ে সব নথি দিয়েছেন, নাম বাদ গিয়েছে তাঁদের একাংশেরও। তালিকা প্রকাশের পরে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি ১-এর বিডিও সায়ন্তন সেন নিজের নাম ‘বিবেচনাধীন’ দেখে দৃশ্যত অবাক হন। বলেন, “সব নথি জমা দিলাম। আমি হতভাগ্য।’’ নন্দীগ্রাম বিধানসভার ৬৬ নম্বর বুথের বিএলও শেখ জাকির হোসেন বলেন, ‘‘২৮ বছর ধরে চাকরি করছি। পাসপোর্ট রয়েছে। শুনানিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি দিয়েছি। তার পরেও আমার নাম বিবেচনাধীন রয়েছে। ’’
এ দিন তালিকা প্রকাশের পরে পূর্ব বর্ধমানের গুসকরায় নাম বাদ যাওয়া কিছু ভোটারের ক্ষোভের মুখে পড়েন এক বিএলও। চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকায় সন্ধ্যায় হুগলির বলাগড়ের কিছু বাসিন্দা ভোটার তালিকা ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় আট জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে বাঁকুড়া শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে এ দিন চলে বিক্ষোভ।
কাটোয়ার ৯৫ বছরের সুবর্ণবালা দে-র নাম এ বারের তালিকায় ‘ডিলিটেড’। বৃদ্ধা বলেন, ‘‘শুনানির নোটিস এসেছিল। আধিকারিকেরা বাড়িতে এসেছিলেন। এ বয়সে এসে ভোটাধিকার হারাব, স্বপ্নেও ভাবিনি!’’