টার্গেট সংখ্যালঘুরাই! গেরুয়া ছক? নির্দিষ্ট কেন্দ্রে লক্ষাধিক ভোটার ‘বিচারাধীন’
বর্তমান | ০২ মার্চ ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: বাছাই করে নাম বাদ—এই অভিযোগ এসআইআরের প্রথম পর্ব থেকেই করে এসেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাছাই কথা অর্থ? যে যে কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস শক্তিশালী, কোপ পড়ছে সেখানেই। কমিশন এবং বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তথ্য-প্রমাণ এবং পরিসংখ্যান কি এড়ানো গিয়েছে? খসড়া তালিকায় তেমনই কিছু প্রমাণ মিলেছিল... নাম বাদের নিরিখে। আর চূড়ান্ত তালিকার প্রথম পর্ব প্রকাশের পর একটা বিষয় স্পষ্ট—টার্গেট সংখ্যালঘুরাই! অন্তত তেমনই দাবি করছে তৃণমূল। কাগজে-কলমেও দেখা যাচ্ছে, যে সব সংখ্যালঘু কেন্দ্রে গত বিধানসভা ভোটে রাজ্যের শাসক দল জিতেছিল, তার সিংহভাগেই ভোটারদের ‘বিচারাধীন’ বলে দেগে দিয়ে সাইডলাইনের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের ভাগ্য ঝুলে বিচারকদের কলমে। রবিবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ইস্যুতে তোপ দেগেছেন কমিশনের বিরুদ্ধে। তাঁর আক্রমণ, ‘এসআইআর শুরুর আগে থেকে বিজেপি নেতারা বলে আসছেন, ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাম বাদ যাবে। এবার ধারাবাহিকতা দেখুন—৫৮ লক্ষ মানুষের নাম প্রথমে বাদ। পরের ধাপে ফর্ম ৭-র মাধ্যমে বাদ পড়েছে ৬ লক্ষ। এরপর ৬০ লক্ষ বিচারাধীন। তাহলে সব মিলিয়ে বিজেপির কথা মতো হল সেই ১ কোটি ২৪ লক্ষ। অর্থাৎ টার্গেট ঠিকই ছিল। কমিশন শুধু সেই আদেশ পালন করেছে। সংখ্যালঘু, তফসিলি, মহিলাদের নাম বেছে বেছে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এরা বিজেপিকে ভোট দেয় না।’
মূলত নিশানা করা হয়েছে মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও দুই ২৪ পরগনাকে। মুর্শিদাবাদ জেলায় তো ‘বিচারাধীন’ ভোটারের সংখ্যা ১১ লক্ষেরও বেশি। যে জেলায় ৭৫ শতাংশ ভোটারই সংখ্যালঘু, সেখানে ১১ লক্ষ সংখ্যাটা চক্ষুলজ্জার ন্যূনতম অবকাশ রাখছে না। নজর করার মতো বিষয় হল, শুধু সামশেরগঞ্জ, সূতি, রঘুনাথগঞ্জের মতো কেন্দ্রপিছুই বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা লক্ষাধিক। মালদহের সুজাপুর আসনেও কিন্তু ভাগ্য ঝুলে রয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ভোটারের। এই প্রত্যেক আসনেই গত বিধানসভা ভোটে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। গোয়ালপোখরের তৃণমূল বিধায়ক গোলাম রব্বানির নামও বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জের বিধায়ক তোরাফ হোসেন মণ্ডলও। নদীয়াতেও পলাশিপাড়া, চাপড়া, কালীগঞ্জের মতো আসনে প্রচুর সংখ্যক সংখ্যালঘু নাগরিককে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অ্যাডজুডিকেশন তালিকায়। মেমারির মহম্মদ জাহাঙ্গিরের নামের আগে ২০০২ সালের তালিকায় শেখ লেখা ছিল, এখন কেন নেই—এই কারণে প্রশ্ন উঠেছে তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে। পশ্চিম বর্ধমান জেলার ন’টি আসনেই অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে চলে গিয়েছেন ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ভোটার। কমিশনের চোখে বাড়তি ‘সন্দেহজনক’ কোথায়? আসানসোল উত্তর। কারণ, সেখানেই রেললাইনের ধার বরাবর বিস্তীর্ণ সংখ্যালঘু এলাকা। পূর্ব মেদিনীপুরেও যেমন সংখ্যালঘু এলাকায় অ্যাডজুডিকেশন তালিকায় থাকা ভোটারের সংখ্যা বেশি। নন্দীগ্রাম-১ ব্লকে ৮ হাজার ৮১৯ জন এবং পাঁশকুড়ায় ৮ হাজার ৬০০। কলকাতা সংলগ্ন মেটিয়াবুরুজে ৭৭ হাজার ভোটারকে বিচারাধীন তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। আরামবাগ ব্লকের মালিপুকুরের বিএলও মণিরুদ্দিন মল্লিক বলেন, ‘আমার বুথের বিচারাধীন প্রত্যেক ভোটারই সংখ্যালঘু। সবাই ফুঁসছেন। যথাযথ নথি অনেকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু...।’
ক্ষোভ বাড়ছে। সংখ্যালঘু এবং মহিলা মহলে। কারণ, এই জাঁতাকলে হয়রানির শিকার তাঁরাও। চোপড়ার মতো কেন্দ্রেই ২৮ হাজারের উপর মহিলা স্থান পেয়েছেন অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে। মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু কেন্দ্রে সংখ্যাটা গড়ে ৫০ হাজার। লক্ষ্য কি? গেরুয়া ছকের বাস্তবায়ন? শুধু তৃণমূল নয়। এই প্রশ্ন এখন আম জনতারও।