• বাংলার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মুখ্যমন্ত্রী, পার্টিই যাঁর কাছে ছিল শেষ কথা, তাই দেশ পায়নি বাঙালি প্রধানমন্ত্রী
    আজ তক | ০৩ মার্চ ২০২৬
  • জ্যোতি বসুকে কখনও শুধু 'জ্যোতি' নামে কাউকে সম্বোধন করতে শুনেছেন? পশ্চিমবঙ্গে এমন একজন মুখ্যমন্ত্রী, যাঁর নামের সঙ্গে নিজে থেকেই বাবু জুড়ে যায়। জ্যোতিবাবু। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কুর্সিতে থাকা মুখ্যমন্ত্রী। ২৩ বছর ৪ মাস। এত বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকার পরেও ভোটে হেরে গিয়ে বা সরকারের ক্ষমতাচ্যূত হওয়ায় মুখ্যমন্ত্রীর পদ যায়নি জ্যোতি বসুর। শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে নিজের ইচ্ছেয় মুখ্যমন্ত্রী পদ ত্যাগ করেছিলেন ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে। দায়িত্ব নিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। 

    জ্যোতি বসু শুধু বাংলার মুখ্যমন্ত্রীই ছিলেন না, ভারতে বাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ। গোটা পৃথিবী এই বাঙালি রাজনীতিবিদকে চেনে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই নামটি শুধু একটি ব্যক্তিত্ব নয়, বরং এক দীর্ঘ সময়ের প্রতীক। 

    কলেজ জীবনেই বাম রাজনীতিতে

    ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় জন্ম জ্যোতি বসুর। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করার পর তিনি আইন পড়তে যান ইংল্যান্ডে। লন্ডনে থাকাকালীন তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন এবং মার্ক্সবাদী দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার ভিত তৈরি হয়। দেশে ফিরে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। রেল শ্রমিক সংগঠনে তাঁর কাজ তাঁকে দ্রুত পরিচিত করে তোলে।

    ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে মুখ্যমন্ত্রী হন

    ১৯৪৬ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হয়ে তাঁর বিধানসভা জীবন শুরু। স্বাধীনতার পরও তিনি ধারাবাহিকভাবে নির্বাচিত হন। ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গের অস্থির রাজনীতির সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় তিনি উপমুখ্যমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় থেকেই প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন। এই সরকার পরপর সাতবার নির্বাচনে জয়লাভ করে, যা ভারতীয় রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল প্রশাসন দেয়। রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিরতার পর একটি স্থায়ী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ, এবং সে ক্ষেত্রে তিনি সফল হন বলে অনেকেই মনে করেন।

    গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ভূমি সংস্কার

    তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ভূমি সংস্কার। ‘অপারেশন বর্গা’র মাধ্যমে ভাগচাষিদের অধিকার স্বীকৃত হয় এবং জমির মালিকানায় স্বচ্ছতা আনা হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় পরিবর্তন আসে। পাশাপাশি তিনস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়, যাতে গ্রামস্তরে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়িত হয়। এই পদক্ষেপগুলি গ্রামবাংলায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো বদলে দেয়। বহু গবেষকের মতে, এই গ্রামীণ ভিত্তিই বামফ্রন্টের দীর্ঘ রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম কারণ।

    বাংলাকে শিল্প থেকে বঞ্চিত রাখার অভিযোগ

    তবে তাঁর শাসনকাল একেবারেই বিতর্কহীন ছিল না। আশির দশকের পর থেকে শিল্পক্ষেত্রে মন্দা, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। শ্রমিক রাজনীতি ও ধর্মঘট সংস্কৃতি শিল্পপতিদের নিরুৎসাহিত করেছে, এমন অভিযোগও ছিল। নব্বইয়ের দশকে যখন সারা দেশে অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু হয়, তখন পশ্চিমবঙ্গ সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। জ্যোতি বসু পরবর্তী সময়ে শিল্পায়নের পক্ষে জোর দেন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিকাঠামো উন্নয়নের কিছু প্রচেষ্টা দেখা যায়, তবে সমালোচকদের মতে তা যথেষ্ট ছিল না।

    প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব ও ঐতিহাসিক ভুল

    জাতীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন। ১৯৯৬ সালে কেন্দ্রীয় স্তরে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের সময় তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর দল সিপিএম সিদ্ধান্ত নেয় সরকারে যোগ না দেওয়ার। ফলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি। পরে তিনি নিজেই এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে উল্লেখ করেন। এই ঘটনাটি ভারতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যক্তিত্বের দিক থেকে জ্যোতি বসু ছিলেন সংযত, মার্জিত এবং পরিমিতভাষী। বিধানসভায় তাঁর বক্তৃতা ছিল যুক্তিনির্ভর ও সংক্ষিপ্ত। বিরোধী দলগুলির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখতেন। প্রশাসনে তাঁর ধরন ছিল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর উপর আস্থা রেখে কাজ করা। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি দলীয় কাঠামোকে গুরুত্ব দিতেন, যা তাঁর নেতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য।

    ২০০০ সালে শারীরিক কারণে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গেলেও তিনি বাম রাজনীতির এক অভিভাবকসুলভ মুখ হয়ে থাকেন। ২০১০ সালে তাঁর প্রয়াণে রাজ্যজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও বিভিন্ন দলের নেতারা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

    জ্যোতি বসুর উত্তরাধিকার তাই বহুমাত্রিক। তিনি একদিকে গ্রামীণ সংস্কারের রূপকার, অন্যদিকে শিল্পোন্নয়নের প্রশ্নে বিতর্কিত শাসক। তিনি স্থিতিশীলতার প্রতীক, আবার পরিবর্তনের গতির বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়া নেতা। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, পশ্চিমবঙ্গের সমকালীন ইতিহাসে তাঁর প্রভাব গভীর ও স্থায়ী। 
  • Link to this news (আজ তক)