সুশান্ত বণিক, আসানসোল
দিন–রাত বলে আলাদা কিছু নেই। থেকে থেকেই বোমা বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে বুক। ঘন ঘন মোবাইল ফোনে ভেসে উঠছে সতর্কীকরণের বিজ্ঞপ্তি। চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে একরত্তিকে বুকে আঁকড়ে আতঙ্কের প্রহর গুনছে মুখোপাধ্যায় দম্পতি। সেখান থেকে প্রায় ৩২০০ কিলোমিটার দূরের শহর আসানসোলে বসে তাঁদের নিরাপদে ফেরার আশায় বুক বেঁধেছেন স্বজনরা।
কর্মসূত্রে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) রাজধানি আবুধাবির অ্যানাইন শহরে স্ত্রী ও এক বছরের ছেলেকে নিয়ে থাকেন ত্রিনাথ মুখোপাধ্যায়। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত, ফলে প্রকাশ্যে কিছু বলায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী অঙ্কিতা মুখোপাধ্যায় মোবাইল ফোনে জানালেন সেখানকার পরিস্থিতির কথা। জানালেন, এই মাসে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাই দেশে ফিরবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। সঙ্গে দোল উৎসবও কাটাবেন আত্মীয়দের সঙ্গে। প্রস্তুতি নেওয়াও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার (Iran vs Israel War) যৌথ আক্রমণে পাল্টে গিয়েছে সামগ্রিক পরিস্থিতি। ভয়ঙ্কর যুদ্ধের (War) আবহে গত তিন দিন ধরে তাঁরা সম্পূর্ণ গৃহবন্দি।
অঙ্কিতা বলছিলেন, ‘আমরা নিরাপদে আছি ঠিকই কিন্তু প্রচণ্ড ভয় করছে। অবস্থা যা হয়েছে, তাতে নিজেরাও ব্যবস্থা করে দেশে ফিরতে পারব বলে মনে হয় না।শুনছি ভারতের বিদেশমন্ত্রী আমাদের মতো নাগরিকদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। আমাদের আবেদন, দ্রুত সেই ব্যবস্থা করুন।’
অঙ্কিতাদের শহর আবুধাবি থেকে মাত্র ১২০ কিলোমিটার দূরে। ওমান সীমানা মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যেক মুহূর্তে উপলব্ধি করছেন। বলছিলেন, ‘তিন দিন আগে সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল গোটা এলাকা। আকাশে রকেটের মতো ছুটছে ফানুস। ঘন ঘন সাইরেন বাজছে। প্রশাসনের তরফে ঘোষণা করা হয়, বাড়ির বাইরে বেরনো যাবে না। এমনকী দরজা–জানলার কাছে দাঁড়াতেও নিষেধ করা হয়েছে। মোবাইল ফোনেও এই সতর্কতাও পাঠানো হয়।’
অঙ্কিতা বলছেন, ‘স্বামী সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত বলে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আগাম আঁচ পেয়েছিলেন। মানসিক একটা প্রস্তুতি ছিল। তবে এমন ভয়াবহ অবস্থা হবে, তা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি।’ যোগ করেন, ‘পাকিস্তানের জঙ্গি ঘাঁটিতে ভারতের বোমা বিস্ফোরণের ছবি টিভিতে দেখেছিলাম। এ বার তেমনই ছবি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। আকাশে ড্রোনের মেলা। ছুটছে মিসাইল।’ রবিবার রাতে তাঁদের বাড়ি থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে ওমান উপকূলে একটি তেল ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণ হয়েছে। ইরানের দিক থেকে ড্রোন হামলা হয়েছে। ২০ জন কর্মী মারা গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ভারতীয় রয়েছেন।
অঙ্কিতার মা মৌমিতা সরকার আসানসোলে একাই থাকেন। সোমবার তিনি বলেন, ‘খুবই চিন্তায় রয়েছি। সরকার ওদের ফেরানোর ব্যবস্থা করলে নিশ্চিন্ত হই।’ জামুড়িয়ার শ্রীপুর এলাকায় অঙ্কিতার শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুর সৌরীশ মুখোপাধ্যায় ইসিএল–এর প্রাক্তন আধিকারিক। তিনি বললেন, ‘আমার দুই এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ওরা বিদেশেই থাকে। এ দেশে চাকরির তেমন সুযোগ নেই বলে বিদেশে গিয়েছে। রোজই কথা হচ্ছে। আতঙ্কে রয়েছি।’ অঙ্কিতার শাশুড়ি শম্পা মুখোপাধ্যায় মেয়ে এবং জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় শুধুই প্রার্থনা করে চলেছেন।