বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, আসানসোল
রংহীন দোল উৎসব আসানসোলে। গোটা বাংলা যখন রঙে মাখামাখি তখন ভিন্ন ছবি বর্ধমানে (Burdwan)। সকাল থেকে রঙিন গোটা বাংলা। নানা জায়গায় পালিত হচ্ছে বসন্ত উৎসব (Basanta Utsav)। এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম বর্ধমান (Burdwan Dol Yatra) জেলা। মঙ্গলবার নয়, এখানে রং খেলা হবে বুধবার। এ রীতি প্রায় ৩০০-৩৫০ বছর ধরে চলে আসছে। অন্য দিকে আসানসোলের ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডে হারমার্ডি রাঙাপাড়া আদিবাসী গ্রামে পালিত হলো রংহীন দোল। যাকে স্থানীয়রা ডাকেন বাহা উৎসব (Baha parab) বলে।
এ দিন জল ও ফুলের রেণু দিয়েই দোল খেলা হয়। আগেই গ্রামের পুরুষরা শাল গাছের রেণু, মহুয়া ফুলের তুলে নিয়ে আসেন জঙ্গল থেকে। সেই রেণু দিয়ে ইষ্টদেবতার পুজো করা হয়। পরে সেই রেণু জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। ধামসা মাদলের তালে তালে নাচে গানে সেই জল দিয়ে বাহা উৎসব পালিত হয়।
গ্রামের বাসিন্দা মোতিলাল সোরেন জানান, এই পরব হয় প্রকৃতির সৃষ্টির উপর ভিত্তি করে। পুজোর স্থানকে বলা হয় জাহের থান। গ্রামের প্রান্তে বা বনের মাঝে শালগাছের নীচে এই পুজো হয়। পুজোর তিন দিনের মধ্যে আজ শেষদিন। সোমবার জাহের থানে পুজো হয়েছে। গাছ বেঁচে থাকলে, প্রকৃতি বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। এই বিশ্বাস থেকেই এই পরব। তিনি আরও জানান, দোলের আগের দিন তাঁদের পুরোহিত বাড়ি বাড়ি ফুল দিয়ে যান। সেই ফুলটি পরের দিন বাসি হলে তাকে ‘বাহা বাস্কি’ বলা হয়। সেই ‘বাহা বাস্কি’ জলে দিয়ে চলে উদযাপন। সঙ্গে আদিবাসী নাচগান, খাওয়াদাওয়া। সারাদিন হুল্লোড় করে কাটে তাঁদের।
অন্যদিকে প্রাচীন রীতি মেনে আজও দোলের পরের দিন রং খেলা হয়। বর্ধমান রাজার কুলদেবতা লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ। রাজ আমলে এই লক্ষ্মীনারায়ণ জিউয়ের মন্দিরে দোলের দিন সবার আগে ঠাকুরের পায়ে রং দেওয়া হতো। তার পরে নানা উৎসব, অনুষ্ঠান, রীতি পালিত হতো। সেই অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে যেত। তাই সে দিন আর রং খেলা হতো না। দোলের পরের দিন রং খেলার চল শুরু হয় সেই রাজার সময় থেকে। যা আজও মেনে চলেন বর্ধমানের বাসিন্দারা।
অনেকে আবার বলেন, দোল পূর্ণিমায় দেবতার পায়ে আবির দেওয়া হতো রাজ আমল থেকে। রাজারা বিশ্বাস করতেন, এ দিন শুধু দেবতার দোল খেলার দিন। মানুষের দোল খেলা পরের দিন। যে হেতু দোলযাত্রার পরের দিন রাজপরিবারের সদস্যরা দোল উৎসবে মেতে উঠতেন, প্রজারাও রাজবাড়ির সেই প্রথাকে অনুসরণ করে পরের দিন মেতে উঠতেন রং খেলায়। রাজপরিবারের পুরোহিত সুমন কিশোর মিশ্র বলেন, ‘রাজা আমল থেকে এই নিয়ম চলে আসছে। দোল পূর্ণিমায় শুধু দেবতার পায়ে আবির দেওয়া হয়। আজ শুধু ঠাকুরের দোল, পরের দিন মানুষের দোল।’