বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: পরমান্ন রান্নায় গোবিন্দভোগ না হলে চলে না বাঙলির। এক চামচ ঘি, কাঁচালঙ্কা দিয়ে মেখে আলুভাতে-ভাতেরও সেরা স্বাদের ভরসা সেই গোবিন্দভোগই। স্বাদ, সুবাস আর ঐতিহ্যে ভরা এই চাল বাংলার নিজস্ব সম্পদ। আন্তর্জাতিক খ্যাতির চূড়ায় রয়েছে সে। দেশীয় এই চালের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই তকমা এসেছে বাংলা থেকেই। সেই চালের দাম নিয়ে গতবছর খুব বেকায়দায় পড়েছিল ক্রেতারা। দাম পৌঁছে গিয়েছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। তবে গতবছর মার খেয়েছিল গোবিন্দভোগ চালের উৎপাদন। তাই চড়েছিল দাম। মানুষ আশা করেছিল, এই শীতে নতুন ধান উঠলে, দাম কমবে। তারপর প্রাথমিকভাবে দাম নেমেওছিল কিছুটা। কিন্তু সেই সুখ ক্রেতাদের কপালে রইল না। গতবারের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ ফলন হয়েছে গোবিন্দভোগের। কিন্তু অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে ফের লাগামছাড়া বাংলার এই প্রিয় চালের দাম। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ধানকলে চাল না পাঠিয়ে মজুত করে রাখছেন বেশি লাভ পাওয়ার আশায়। তার ফলেই কপাল পুড়ছে বাঙালির। সামান্য পরিমাণ পায়েস রাঁধতেও চোখে জল এসে যাচ্ছে।
গতবছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের গোড়ার দিকে গোবিন্দভোগ চালের দাম ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা কিলো। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০০ পেরিয়ে কোথাও কোথাও আড়াইশো টাকায় পৌঁছায় দাম। ক্রেতাদের আশ্বাস দিয়ে দোকানদাররা তখন বলেছিলেন, ‘এবার চালের উৎপাদন কম হয়েছে তো তাই দাম বেশি। নতুন চাল উঠলেই দাম কমে যাবে।’ তারপর ডিসেম্বর জানুয়ারি নাগাদ দাম কমে, ১০০ থেকে ১২০ টাকা হয়। কিন্তু তারপর হু হু করে বেড়ে গিয়ে বর্তমানে হয়ে গিয়েছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। কেন দাম বাড়ছে চালের?
এ রাজের অন্যতম ব্র্যান্ড ‘রাইস ভিলা’র সিইও সুরজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে বাংলায় গোবিন্দভোগের উৎপাদন হয়েছিল প্রায় দেড় লক্ষ টন। গতবছর তা নেমে এসেছিল প্রায় ১ লক্ষ টনে। উৎপাদন এতটা কমে যাওয়ায় দাম বেড়ে যায়। এবছর কিন্তু উৎপাদন প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার টন হয়েছে। গতবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম অনেক কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু দাম কমছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি ধানকল পর্যন্ত গোবিন্দভোগ এসে পৌঁছচ্ছেই না। একশ্রেণির ব্যবসায়ী তা মজুত করে রাখছেন ভবিষ্যতে আরও বেশি দামে বিক্রি করবেন বলে। উৎপাদন এত বেশি হওয়া সত্ত্বেও এই দাম বৃদ্ধি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা চাই সরকার বিষয়টি দেখুক।’
সুগন্ধি গোবিন্দভোগের বাজার অন্যান্য রাজ্য ছাড়াও ছড়িয়ে রয়েছে দুবাই, ওমান, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও নিউজিল্যান্ডে। সেসব দেশে বেশি পরিমাণ রপ্তানি করে মোটা মুনাফার লোভও ধান মজুতকরণের এই প্রবণতাকে ইন্ধন দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গোবিন্দভোগের লাগাতার দাম বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে বাজার খারাপ করার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে। তার কারণ, দামের জন্য ক্রেতাদের একটি বড়ো অংশ বিকল্প চালের দিকে ইতিমধ্যেই ঝুঁকে পড়েছেন। ‘কোলাম’ নামে একটি চাল ইতিমধ্যেই গোবিন্দভোগের বাজার অনেকটা ধরে নিয়েছে। তার দাম কম। এবং গোবিন্দভোগের গুণমানও তাতে নেই। ব্যবসায়ীদের মতে, বিকল্প চালের বাজার বৃদ্ধি হলে, গোবিন্দভোগ তার নিজের বাজার হারাবে। অন্যদিকে যেহেতু গোবিন্দভোগের দাম বেশ চড়া তাই তার সঙ্গে অন্য আতপ মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে। এই ভেজাল মেশানোর ফলে গোবিন্দভোগের গুণমান নষ্ট হচ্ছে। সুষ্ঠু বিপণনের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অত্যন্ত খারাপ। সরকার যদি বিষয়টিতে এখনই হস্তক্ষেপ না করে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলার এই নিজস্ব অসাধারণ সম্পদ খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াবে।