কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
স্নানের জন্যে বছরের অন্য দিনগুলিতে গড়ে ৫৫ লিটার করে জল খরচ করেন ভারতীয়রা। কিন্তু দোল–হোলিতে স্নানের জন্যে মাথাপিছু জলখরচ এক লাফে বেড়ে যায় ৮৫ লিটারে। এক-এক জনের অতিরিক্ত ৩০ লিটার জল খরচের অর্থ, ১০০ কোটি মানুষ সব মিলিয়ে অন্তত তিন হাজার কোটি লিটার জল বাড়তি খরচ করেন। জলবিজ্ঞানীদের হিসেব, কলকাতায় দিনে মোট ১৩৫ কোটি লিটার জল লাগে। সেই হিসেবে দোলে গোটা দেশে যে পরিমাণ জল বাড়তি খরচ হয়, সেটা কলকাতার ২২ দিনেরও বেশি জল খরচের সমান।
'শুধু একটা টিপ। দোলের দিন এটুকু না হলে হয়!' বন্ধুদের ডাকে দিনের শুরুটা মোটামুটি এমন ভাবেই হয়। কয়েক মিনিট পরে অবশ্য শরীরের দৃশ্যমান অংশে একটা টিপ দেওয়ার মতো জায়গাও আর অবশিষ্ট থাকে না। 'আরে এই রং এক মগ জলেই ধুয়ে যাবে' বলে ফের আশ্বাস দেন বন্ধুরা। একবার শরীরটা 'বেনীআসহকলা'–র সমন্বয়ে পরিণত হওয়ার পরে মনে হয়, পিছিয়ে থেকে আর কী লাভ! তাই রঙের আরও কয়েক কোট প্রলেপ পড়তে সময় লাগে না। দোলখেলার পর্ব মেটার পরে সেই রং তুলতেই নাজেহাল হতে হয়। লেগে যায় বিপুল বাড়তি জল।
এ দিকে, মৌসম ভবনের রিপোর্ট অনুযায়ী, দোলের দিন ওডিশার ঝাড়সুগুদা ও অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুলের তাপমাত্রা পৌঁছে গিয়েছিল ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অর্থাৎ মার্চের প্রথম সপ্তাহেই তাপপ্রবাহের দোরগোড়ায় দেশ। কোনও জায়গার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে এবং সেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৫ ডিগ্রি উপরে থাকলে সেই অবস্থাকে তাপপ্রবাহ বলা হয়। এই পরিস্থিতিতে মার্চ থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জলের চাহিদা বাড়তে থাকে।
অন্য দিকে, সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ড (সিজিডব্লিউবি)–এর তথ্য অনুযায়ী, মাটির গভীর থেকে জল তুলে খরচ করায় পৃথিবীতে এক নম্বরে রয়েছে ভারত। দেশে বছরে প্রায় ২৪৫.৬৪ বিলিয়ন ঘনমিটার জল মাটি থেকে তোলা হয়। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ খরচ হয় কৃষিকাজে। আবার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হাইড্রোলজির তথ্য, প্রতিদিন ভারতে যে পরিমাণ জল তোলা হয়, তার ৩০ শতাংশই নষ্ট হয়।
অঙ্কের হিসেবে সেটা ২,২৪৩ কোটি লিটার! হাইড্রোলজিস্টরা সহজ তুলনা টেনে জানাচ্ছেন, অলিম্পিক্সে যে ধরনের সুইমিং পুলে সাঁতারের প্রতিযোগিতা হয়, তাতে ২.৫ মিলিয়ন লিটার বা ২৫ লক্ষ লিটার জল ধরে। সেই হিসেবে ভারতে প্রতিদিন যা জল অপচয় হয়, তা দিয়ে ৮৯,৭২০টি অলিম্পিক সুইমিং পুল ভর্তি করা যায়। আর দোলের দিনে অতিরিক্ত যে জল খরচ করে ভারত, তা দিয়ে ১২ হাজার অলিম্পিক্স সুইমিং পুল ভরা সম্ভব।
২০২৫–এ ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার প্রাইজ়–জয়ী জলবিজ্ঞানী হিমাংশু কুলকার্নির মন্তব্য, 'হোলি আমাদের দেশের পুরোনো একটি উৎসব। আমরা এক বারও এই উৎসব বন্ধ করার কথা বলছি না। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে, হোলিতে বিভিন্ন রকমের কড়া রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়ছে। সেই রঙ তুলতে অনেক বেশি জল ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন সবাই। তাই সচেতন নাগরিকদের কাছে অনুরোধ, কোন ধরনের রঙ ব্যবহার করা হবে, সে দিকে খেয়াল রাখুন।'
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, মাটির নীচে যে জল পাওয়া যায়, তা আসলে বৃষ্টির জল। কিন্তু দেশের সর্বত্র বৃষ্টির পরিমাণ এক রকম নয়। তাই ভৌম জলস্তরের বিন্যাসেও ফারাক রয়েছে। এই কারণেই মাটি থেকে জল তোলা ও সেই জল খরচের বিষয়ে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি।