• অবৈধ পার্কিং থেকে বেআইনি বহুতল, হাওড়ায় উড়ছে অপরাধের টাকা
    আনন্দবাজার | ০৫ মার্চ ২০২৬
  • ঘটনা ১: হাওড়া পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বৈরাগিপাড়া। বিভিন্ন বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করা এক মহিলা নিজের ভেঙে পড়া টালির চাল তুলে দিয়ে কংক্রিটের ছাদ তৈরি করাচ্ছিলেন। খবর পেয়েই মোটরবাইকে চেপে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল এলাকার উঠতি দুষ্কৃতীরা। অসহায় ওই মহিলাকে শুনতে হয়েছিল হাড় হিম করা হুমকি— ‘‘দাদার অফিসে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে আসবি, না হলে মরবি।’’

    ঘটনা ২: হাওড়া পুরসভার ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের বালিটিকুরি বাজার। অবসরপ্রাপ্ত এক সেনাকর্মী রাস্তার পাশে একটি চারতলা বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। সেই বাড়ির নীচের তলায় তিনি দোকানঘর করেছিলেন ভাড়া দেওয়ার জন্য। এক দিন ওই বাড়ির সামনে এসে প্রাক্তন সেনাকর্মী দেখেন, একতলার দোকানঘরের শাটারের তালা ভাঙা। রাতারাতি দোকানঘর বদলে গিয়েছে শাসকদল তৃণমূলের পার্টি অফিসে। বাইরে পতপত করে উড়ছে ঘাসফুল ছাপ পতাকা। প্রাক্তন সেনাকর্মীর দাবি, পুলিশে অভিযোগ জানানো হলেও কোনও সুরাহা হয়নি।

    ঘটনা ৩: বেআইনি পার্কিং রোখার জন্য শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকার সাতটি জায়গায় বৈধ পার্কিং ব্যবস্থা চালু করতে হাওড়া পুরসভার পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু অভিযোগ, শাসকদলের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীদের খুনের হুমকির জেরে দরপত্র জমা দিতে সাহস করেনি কোনও সংস্থা। ফলে, বৈধ পার্কিং ব্যবস্থাও চালু হয়নি। বর্তমানে প্রতিটি পার্কিং জ়োন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কয়েক গুণ বেশি হারে সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে পার্কিং-ফি আদায় করছে দুষ্কৃতী বাহিনী। আর সব জেনেও ঠুঁটো হয়ে বসে হাওড়া পুরসভার কর্তারা।

    সম্প্রতি উত্তর হাওড়ার পিলখানায় এক প্রোমোটারকে প্রকাশ্যে গুলি করে খুনের ঘটনার পরে সামনে এসেছে শাসকদল-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীদের গোষ্ঠী বিবাদের ছবি, যার মূলে রয়েছে টাকাপয়সার বখরা নিয়ে মতবিরোধ। এই প্রতিবেদনের শুরুতে শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকার তিনটি ঘটনা যে আসলে গোটা হাওড়া শহরেরই বেলাগাম দুষ্কৃতী-রাজের খণ্ডচিত্র, তা নিয়ে প্রশাসনের একাংশও একমত। আর তোলাবাজির এই বেপরোয়া মনোভাবই শাসকদলের ‘দাদাদের’ প্রশ্রয়ে দুষ্কৃতীদের একাধিক গোষ্ঠীতে ভাগ করে দিয়েছে। হাওড়ার ২২, ৪৭ ও ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে একটু ঘুরলে সকলের চোখেই সেই ছবি ধরা পড়বে। যেমন, সানপুর, দাশনগর, কামারডাঙা বা শৈলেন মান্না সরণির সর্বত্র চলছে বেআইনি পার্কিং, পুকুর ভরাট করে বহুতল নির্মাণ। পুর আইন ভেঙে ২২ নম্বর ওয়ার্ডের মুসলমান পাড়া, মধুসূদন পালচৌধুরী লেন এবং ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের ঘিঞ্জি এলাকায় তৈরি হয়েছে একের পর এক বহুতল। আবার দাশনগরের মেলাতলায় অবাধে চলছে চোলাইয়ের ঠেক। এলাকার এক সময়ের কুখ্যাত দুষ্কৃতী যদু মাকাল না থাকলেও উঠে এসেছে নতুন দুষ্কৃতীরা। যাদের কাছে অবাধে চলে আসছে দেশি, বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র।

    দুষ্কৃতীদের মধ্যে কেন তৈরি হয় গোষ্ঠী বিবাদ? ধরা যাক, ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের কোনার পর্বতপাড়ায় শান্তনু ভট্টাচার্য নামে এক ব্যক্তির ১২ কাঠার পুকুর বোজানোর ঘটনা। পুকুরটি দিনেদুপুরে বোজাচ্ছিল ওই এলাকার কয়েক জন তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতী। বিরোধী গোষ্ঠীর দুষ্কৃতীরা সেই খবর পেয়ে পুরসভা ও প্রশাসনকে জানিয়ে দেয়। এর পরেই নোটিস ঝুলিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয় পুরসভা। এ নিয়েই শুরু হয় দুষ্কৃতীদের গোষ্ঠী বিবাদ। ওই কেন্দ্রের তৃণমূল নেতারাই বলছেন, শুধু তোলাবাজি করার জন্যই দলের একাংশ দুষ্কৃতী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রে। গত এক বছরে বহু অচেনা মুখে ভরে গিয়েছে এলাকা। তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে বেআইনি বহুতল নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রোমোটারদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, একের পর এক পুকুর ও জলাজমি ভরাট, বন্ধ কলকারখানা দখল করে প্রোমোটিং, পার্কিং জ়োন দখল করে তোলাবাজি, বাড়ি ভাঙা এবং নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য।

    বাম আমল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পুরসভার অনুমতি নিয়ে কে-৬ বাস স্ট্যান্ড থেকে চ্যাটার্জিপাড়া বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত পার্কিং জ়োনের দায়িত্ব সামলেছেন ব্যাঁটরা থানা এলাকার বাসিন্দা রাজেশ তিওয়ারি। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, ২০২৩ সালের পরে এলাকার দুষ্কৃতীরা তাঁকে রীতিমতো হুমকি দিয়ে ‘মাসোহারা’ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। রাজেশ বলেন, ‘‘আমি ওদের জানিয়ে দিই, মাসোহারা দেব না। তার পর থেকেই আমাকে নানা ভাবে পার্কিং থেকে টাকা তুলতে বাধা দেওয়া শুরু হয়। গাড়ি এলেই চালককে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। শেষে আমি অন্য জায়গায় পার্কিং জ়োনের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হই।’’ রাজেশ জানান, বর্তমানে এলাকার সাতটি পার্কিং জ়োন ওই দুষ্কৃতীদের কবলে। পার্কিং-ফি বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় হলেও পুরসভার ভাঁড়ারে ঢোকে না এক টাকাও।

    ওই বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা, হাওড়া পুরসভার এক প্রাক্তন তৃণমূল পুরপ্রতিনিধি বলেন, ‘‘দলের এক শ্রেণির জনপ্রতিনিধির মদতে গোটা শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্র সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। গত এক বছরের মধ্যে বহিরাগত অ-বাংলাভাষী দুষ্কৃতীর সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, তাতে এলাকার পুরনো বাসিন্দারা আতঙ্কিত।’’

    প্রাক্তন ওই পুরপ্রতিনিধি জানালেন, এলাকায় দুষ্কৃতী-দৌরাত্ম্য ও তাদের কাজে লাগিয়ে জনপ্রতিনিধিদের একাংশের অবাধ তোলাবাজির বিরুদ্ধে ছ’জন প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধি দল বেঁধে দলের উচ্চ নেতৃত্বের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। কিন্তু তার পরেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। অবাধে চলছে দুষ্কৃতী-রাজ।

    এ থেকে মুক্তি কী ভাবে? তারই উত্তর খুঁজে চলেছে হাওড়া।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)