বনবিবির আরাধনায় সম্প্রীতির বাঁধন। আর সেই বন্ধনেই ম্যানগ্রোভ রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ আর্মির মহিলারা। গ্রীষ্মকালে, যে সময়ে সুন্দরবনে প্রাকৃতির দুর্যোগ এসেছে বার বার, সে সময়েই ম্যানগ্রোভ আর্মির মহিলারা পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে তৎপর।
মে-জুন মাস এলেই আতঙ্কে থাকে সুন্দরবন। অতীতে ভয়ঙ্কর সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটেছে এই সময়েই। তবে সেই সমস্ত দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনকে আগলে রাখে তার সম্পদ, ম্যানগ্রোভ অরণ্য। তা বাঁচাতেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছে ম্যানগ্রোভ আর্মি। গোসাবার বাসিন্দা মুর্শিদাবাদের একটি স্কুলের ভূগোলের শিক্ষক উমাশঙ্কর মণ্ডলের মহিলাদের নিয়ে তৈরি করেন এই দলটি। বনবিবির আরাধনার মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ রক্ষা করে সুন্দরবনকে আগলে রাখতে তৎপর তাঁরা।
এই দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে উমাশঙ্কর আয়োজন করেন বনবিবির পুজোর। বনবিবি হলেন সুন্দরবনের এমন এক লোকদেবী, যিনি সুন্দরবন এলাকার সমস্ত ধর্মের মানুষের কাছেই পূজনীয়। সুন্দরবনবাসীর বিশ্বাস, বনবিবি সুন্দরবনের জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া বা মাছ-কাঁকড়া ধরতে যাওয়া মানুষদের বাঘ ও অন্য বন্যপ্রাণীর হাত থেকে রক্ষা করেন। প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে এই দেবীর পুজো হয় ঘটা করে। এরপর প্রতি পূর্ণিমায় সারা বছর ধরেই নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বনবিবির আরাধনা চলে। সুন্দরবনের গভীরে, বিশেষত দোবাঁকি, মৈপীঠের মতো বিভিন্ন জায়গায় বনবিবি মন্দির রয়েছে।
গোসাবার চরঘেরিতে এই পুজোকে সামনে রেখেই সুন্দরবনকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হয়েছেন উমাশঙ্কর। তিনি বলেন, ‘‘বনবিবির উপাখ্যান মানুষের লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। ম্যানগ্রোভের বন পাখি, মৌমাছি ও মাছের নিরাপদ আশ্রয়, তা বনবিবি উপাসনার মাধ্যমে একটি পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য হয়, যা বনভূমিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘বনবিবি হলেন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশের রক্ষক, যার প্রতি আস্থাই এখানকার জীবন ও প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটায়।”
বনবিবি উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন করে ম্যানগ্রোভ রোপণ করে চলেছেন ম্যানগ্রোভ আর্মির মহিলারা। তাঁদের কথায়, ‘‘এই দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনকে বাঁচিয়েছে সেই ম্যানগ্রোভ। তাই আমাদের লক্ষ্য একে রক্ষা করা ও আরও আরও বেশি করে ম্যানগ্রোভ ভূমি গড়ে তোলা।’’
পরিবেশবিদ, অধ্যাপক মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, “সুন্দরবনের মহিলাদের নিয়ে তৈরি ম্যানগ্রোভ আর্মি পরিবেশ রক্ষায় অনন্য ভূমিকা গ্রহণ করেছে।’’ সুন্দরবন গবেষক জয়ন্ত গৌড় বলেন, ‘‘এই দেবীর আরাধনা সুন্দরবন এলাকার মানুষের সমস্ত ধর্ম, জাতপাতের বিভেদ ভেঙে দিয়েছে। তা সামনে রেখে ম্যানগ্রোভ রক্ষার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা অনবদ্য।’’
উমাশঙ্করের মতে, এই পুজো শুধু ধর্মীয় নয়, এটি সুন্দরবনের মানুষজনের জীবন-জীবিকা ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রতিফলন, যা তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করে। সম্প্রীতির বন্ধনে রক্ষা করা হয় প্রকৃতিকে। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশবিদ সৌভিক চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বনবিবি পুজোকে সামনে রেখে যে উদ্যোগ করা হয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”