এসআইআরের নামে গেরুয়া ছক, ভোট কাটার খেলা? সংখ্যালঘু প্রভাবিত ৫ জেলায় বাদ ২৩ লক্ষ, বিচারাধীন ৩৫ লক্ষ ভোটার!
বর্তমান | ০৫ মার্চ ২০২৬
শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: এসআইআরের নামে ভোট কাটার খেলা? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিস্ফোরক অভিযোগই ধীরে ধীরে দিনের আলো দেখছে। আর তার প্রমাণ দিচ্ছে পরিসংখ্যান। চূড়ান্ত ভোটার তালিকার প্রথম পর্ব প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু প্রভাবিত কয়েকটি জেলা রাজ্য প্রশাসনের মাথায় চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। এবং তৃণমূল কংগ্রেসেরও। কারণ, পাঁচটি জেলার হিসাব কষলেই দেখা যাচ্ছে, ইতিমধ্যে প্রায় ২৩ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে। আর এই পাঁচ জেলাতেই ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় ঝুলে রয়েছে ৩৫ লক্ষাধিক ভোটারের ভাগ্য। রবিবার রাতে রাজ্যে এসে পৌঁছাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বাধীন ফুল বেঞ্চ। তার মধ্যেই বিতর্ক বাড়ছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লাগাতার অভিযোগ করে চলেছেন, গোটাটাই বিজেপির ছক। তাদের নির্দেশেই জ্ঞানেশ কুমাররা অঙ্ক মেলানোর খেলায় নেমেছেন। এই পাঁচটি জেলার সমীকরণ কিন্তু সে কথাই বলছে। উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং দুই ২৪ পরগনা। এর মধ্যে উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ ও মালদহে সংখ্যালঘু ভোটার সর্বাধিক। উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত এলাকায় যেমন মতুয়া ভোট রয়েছে, তেমনই আছে বিপুল সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটারও। আর একটি জেলা দক্ষিণ দিনাজপুর। এখানে ইতিমধ্যেই বাদ গিয়েছে ৯৬ হাজার ১৭৯ জনের নাম। আর তারপরও ‘বিচারাধীন’ ১ লক্ষ ৩২ হাজার ২৫৮ জন। কেন কয়েকটি জেলাকে ঘিরেই ‘অ্যাডজুডিকেশন লিস্ট’ ফুলেফেঁপে উঠেছে?
উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং দুই ২৪ পরগনার বিধানসভা কেন্দ্রগুলি নজরে আনলেই দেখা যাবে, পাঁচ বছর আগে ভোটে এইসব আসনেই বড়োসড়ো ব্যবধানে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। পাঁচ জেলার ১০৫টির মধ্যে ৯১টিতেই ব্যাপক মার্জিনে জয় ছিল বাংলার শাসক দলের। বিজেপির দখলে ছিল মাত্র ১৩টি আসন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যানে আবার দেখা যাচ্ছে, ওই ১৩টি আসনও ধরে রাখতে পারেনি গেরুয়া ব্রিগেড। তাই কি বেছে বেছে ভোট কাটার সমীকরণ? পাঁচ জেলার ওই ১০৫টি আসনে ইতিমধ্যে যত সংখ্যক নাম বাদ গিয়েছে, তার সঙ্গে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা যোগ করলেই দেখা যাবে, সেই ব্যবধান ইতিহাস হয়ে গিয়েছে। বিজেপির দাবি, ভোটব্যাংকে হাত পড়েছে তো গেরুয়া শিবিরেরও। তৃণমূলের পালটা জবাব, তাহলে কেন শুধু সংখ্যালঘু প্রভাবিত জেলাগুলির ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান সামনে আসছে? এই ভোটব্যাংক নিশ্চিতভাবে তৃণমূলের বলেই তো! সবচেয়ে বড়ো কথা, কোন অঙ্কে এত সংখ্যক ভোটারকে ‘অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে’ ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা কমিশন বা তাদের নিযুক্ত মাইক্রো অবজার্ভাররা দিচ্ছেন না। সাধারণ মানুষের বিপুল ক্ষোভের মুখে পড়ে উলটে ইআরও এবং এইআরওদের দায়ী করছেন তাঁরা। সিইও দপ্তরের তরফে ইতিমধ্যেই রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে দিল্লির নির্বাচন সদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ইআরও এবং এইআরওদের ভুলেই যত বিপত্তি। ভোটার সঠিক নথি জমা দিলেও তা নাকি আপলোডই করেননি ইআরও-এইআরওরা! এই সংক্রান্ত একাধিক তথ্যও পাঠানো হয়েছে কমিশনে। পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ইআরও এবং এইআরওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? বিশেষজ্ঞদের দাবি, আসলে নাম বাদের পিছনে তাঁদের নিযুক্ত মাইক্রো অবজার্ভারদের ভূমিকা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আর তাতেই বিপাকে পড়েছে কমিশন। এবার মাইক্রো অবজার্ভারদের আড়াল করতে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে রাজ্যের অফিসারদের।