এই সময়: রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘সার’-নিয়ে আজ, শুক্রবার দুপুরে ধর্মতলায় ধর্নায় বসবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘সার’ নিয়ে শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে এক বন্ধনীতে রেখে চড়া সুরে আক্রমণ শাণিয়ে চলেছেন তৃণমূলনেত্রী। বৃহস্পতিবার ছিল মতুয়াদের বড়মা, প্রয়াত বীণাপাণি দেবীর প্রয়াণ দিবস। বড়মাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এ দিন ফের ‘সার’-এর নামে মতুয়াদের চরম বিপদে ফেলার জন্য কমিশন এবং বিজেপিকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, মতুয়াদের নিয়ে রাজনীতির খেলা চলছে। নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে তাঁদের বিপদের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠছে, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া-সহ একাধিক জেলায় বহু মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এমনকী, বহু নাম রাখা হয়েছে ‘বিচারাধীন’ বা ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ হিসেবে। যা নিয়ে মতুয়াদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক-উদ্বেগ। এমনকী, দেশ ছাড়া হওয়ার শঙ্কাও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁদের অনেককে। বড়মাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মমতা এদিন সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের চক্রান্তে আজ এক অস্থির ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে মতুয়া ভাই-বোনদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে রাজনীতির খেলা চলছে।’
বড়মাকে প্রণাম জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, ‘শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রদর্শিত পথে মতুয়া মহাসঙ্ঘ বাংলার সামাজিক সংস্কার ও নবজাগরণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দলিত ও অবহেলিত মানুষের অধিকার রক্ষা, শিক্ষার প্রসার এবং জাতপাতহীন এক মানবিক সমাজ গড়ার যে আন্দোলন এই মহাসঙ্ঘ শুরু করেছিল, বড়মা সারাজীবন সেই আদর্শকেই লালন করেছেন।’ শুধু তাই নয়, বড়মার সঙ্গে তাঁর যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল, তা–ও এ দিন তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি লেখেন, ‘তাঁর মাতৃস্নেহের পরশ আমি নিবিড়ভাবে পেয়েছিলাম – এ আমার জীবনের পরম পাওয়া। তাঁর চিকিৎসা–সহ যে কোনও দরকারে তিনি যখনই আমাকে ডেকেছেন, আমি ছুটে গিয়েছি তাঁর কাছে। এটা আমার গর্ব, আমাদের সরকার তাঁর অসামান্য সামাজিক অবদানের জন্য বড়মাকে রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’-এ ভূষিত করেছিল।’
পাশাপাশি মতুয়াদের কল্যাণে রাজ্য সরকার যে সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ করেছে, তা–ও এ দিন সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরেন প্রশাসনিক প্রধান। তাঁর কথায়, ‘মতুয়া সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্যও আমরা নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মতুয়া বিকাশ পর্ষদ ও নমঃশূদ্র বিকাশ পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরকে সম্মান জানিয়ে তাঁর জন্মদিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ঠাকুরনগরে, ঠাকুরবাড়ির কাছাকাছি হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে।’ সবশেষে তাঁর আশ্বাস, ‘আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি—আমরা আপনাদের পাশেই আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। ভয় পাবেন না, আমরা আছি আপনাদের পাশে।’
মমতার এই আশ্বাসকে অবশ্য কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিজেপি। দলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘মতুয়াদের যে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই, সেটা প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার বলেছেন। তারপরেও শুধুমাত্র ভোটের স্বার্থে তৃণমূল মিথ্যে প্রচার করছে।’ ওই নেতার সংযোজন, ‘মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য অনেক আগেই সিএএ কার্যকর করা হয়েছে। তখন এই মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দলই মিথ্যে প্রচার চালিয়ে মতুয়াদের বিভ্রান্ত করেছেন। আমাদের স্পষ্ট কথা, মতুয়াদের নাগরিকত্ব যাবে না। তাঁদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। তাঁরা যেন তৃণমূলের ফাঁদে পা না–দেন।’
উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার পাশাপাশি পূর্ব বর্ধমান, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অনেকগুলি বিধানসভা কেন্দ্রে মতুয়া ভোট বড় ফ্যাক্টর। নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ১ লক্ষ ৪২ হাজারের বেশি এবং নদিয়ায় ২ লক্ষ ৭৬ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। শেষমেশ ভোটবাক্সে এর কতটা প্রতিফলন ঘটে, সে দিকেই নজর শাসক–বিরোধী সব পক্ষের।