West Bengal Assembly Election Kurseong: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতেই পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে সকলকে চমকে দেওয়া বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। এই দলবদলের ফলে কার্শিয়ং আসনে বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্য এখন বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে অনীত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা (বিজিপিএম) এবং শাসকদল তৃণমূলের কৌশলগত জোট পাহাড়ের উন্নয়নে জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে বিমল গুরুং ও জিএনএলএফ-এর সমর্থনে নিজেদের গড় ধরে রাখতে মরিয়া বিজেপি।
বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা তাঁর দলবদল নিয়ে সাফ জানিয়েছেন যে, বিজেপি পাহাড়ের মানুষের আবেগ নিয়ে কেবল রাজনীতি করেছে, কিন্তু স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান বা গোর্খাল্যান্ডের প্রশ্নে কোনো সদর্থক ভূমিকা নেয়নি। তিনি বলেন, “পাহাড়ের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলা জরুরি, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই সম্ভব।” অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষ্ণুপ্রসাদের আগমনে পাহাড়ে বিজেপির ভিত্তি ধসে পড়েছে এবং অনীত থাপার সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গে তৃণমূলের জোট কার্শিয়ংয়ে জয়ের বিষয়ে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত।
পাল্টা সুর চড়িয়েছে বিজেপি শিবির। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা ব্যক্তিগত স্বার্থে দলবদল করেছেন এবং বিধায়ক হিসেবে তাঁর পারফরমেন্সে সাধারণ মানুষ খুশি নন। বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়া বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন দিল্লির নেতৃত্বের প্রতি। তিনি বলেন, “বিজেপি পাহাড়ের মানুষের আবেগকে কেবল ভোটের হাতিয়ার করেছে। গোর্খাল্যান্ড বা ১১টি জনজাতির স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আমি বুঝেছি, পাহাড়ের প্রকৃত উন্নয়ন এবং সমস্যার সমাধান একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই সম্ভব। তাই উন্নয়নের মূল স্রোতে শামিল হতেই এই সিদ্ধান্ত।”
তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা তথা শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব কার্শিয়ঙের এই বদল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানান, “পাহাড়ের মানুষ বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মার মতো জনপ্রতিনিধি যখন আমাদের দলে আসেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে বিজেপির পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছে। অনীত থাপার সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গে আমাদের সরকারি প্রকল্পের মেলবন্ধনে কার্সিয়াং এবার জোড়াফুলের দখলে আসবে।”
পাল্টা হুঙ্কার দিয়েছেন দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত স্বার্থে কেউ দলবদল করলে পাহাড়ের মানুষের লড়াই থেমে যায় না। বিস্তা বলেন, “বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা পাহাড়ের মানুষের সেন্টিমেন্টের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। কিন্তু কার্সিয়াংয়ের মানুষ জানেন, বিজেপিই একমাত্র দল যারা গোর্খাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে। বিমল গুরুং ও জিএনএলএফ-এর মতো পাহাড়ের আদি শক্তিগুলো আমাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ। ভোট কাটাকাটির অঙ্ক কষে তৃণমূল সুবিধা পাবে না।”
এদিকে, অনীত থাপার বিজিপিএম উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে প্রচার শুরু করেছে। অনীত থাপার অনুগামী ও স্থানীয় বিজিপিএম নেতাদের মতে, পাহাড়ের মানুষ আর অশান্তি চায় না, তাঁরা পাট্টা এবং কর্মসংস্থান চায়। তৃণমূলের সঙ্গে তাঁদের জোট মূলত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য। তবে এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাঝে অজয় এডওয়ার্ডের ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, যা ভোট কাটাকাটির অঙ্কে বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর লড়াইয়ে কার্শিয়ঙের ভাগ্য গোর্খা আবেগ নাকি উন্নয়নের অঙ্কে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অজয় এডওয়ার্ডের ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট যদি কার্শিয়ঙের শিক্ষিত যুবকদের ভোট কাটতে সফল হয়, তবে লড়াই আরও কঠিন হবে। গোর্খাল্যান্ডের চিরন্তন আবেগ বনাম উন্নয়নের এই লড়াইয়ে ২০২৬-এর বসন্তে কার্সিয়াং কার দিকে ঝোঁকে, এখন সেটাই দেখার।