এই সময়: মেয়াদ ফুরোনোর আগেই বাংলার রাজ্যপাল পদ থেকে কেন ইস্তফা দিলেন সিভি আনন্দ বোস, তা নিয়ে ধোঁয়াশা ২৪ ঘণ্টা পরেও কাটেনি। তবে এর মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল আরএন রবিকে বাংলায় পাঠানো নিয়ে। রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনা না–করেই কী ভাবে নতুন রাজ্যপালের নাম তড়িঘড়ি চূড়ান্ত করা হলো, তা নিয়ে বৃহস্পতিবারই প্রশ্ন তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বার রবিকে তীক্ষ্ণ ভাষায় নিশানা করল তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে। ২০২১–এ তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বারবার সে রাজ্যের সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন রবি। সেই টানাপড়েন পৌঁছেছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সেই প্রাক্তন আইপিএস রবিকেই বাংলার দায়িত্ব দেওয়ায় শুক্রবার খোঁচা দিয়েছে স্ট্যালিনের দল।
ঘটনাচক্রে বাংলার সঙ্গে বিধানসভা ভোট নির্ধারিত রয়েছে তামিলনাড়ুতেও। এ দিন ডিএমকে সাংসদ পি উইলসন কটাক্ষের সুরে বলেছেন, ‘আগামী বিধানসভা ভোটে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে একজন ‘স্টার ক্যাম্পেনার’কে হারাল।’ রবি বাংলার দায়িত্ব নেওয়ার আগে উইলসনের পূর্বাভাস— ‘তিনি যেখানেই যান সেখানেই সংবিধানের হত্যা হয়।’ সমাজমাধ্যমে তাঁর সংযোজন, ‘বাংলার মানুষ এবং তৃণমূলে আমার বন্ধুদের জন্য দুঃখ হচ্ছে। তিনি যেখানেই যান সেখানে সংবিধান হত্যার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেন।’ শেষে তিনি লিখেছেন, ‘থ্যাঙ্কস ফর নাথিং, মিস্টার রবি।’
বোসের বিদায় নিয়ে এ দিন কলকাতায় প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, রাজ্যপাল বদল করেও বাংলায় ক্ষমতা দখলের ইচ্ছেপূরণ হবে না বিজেপির। এ দিন ধর্মতলায় তৃণমূলের ধর্নামঞ্চ থেকে তিনি বলেন, ‘কালকে আবার রাজ্যপালকে পদত্যাগ করিয়েছে, দেখেছেন? নির্বাচনের এক মাস আগে! কী এমন ঘটল যে, রাজ্যপালকে পদত্যাগ করাতে হলো? বাংলায় যে আসে তাকেই পদত্যাগ করাতে হচ্ছে? একবার জগদীপ ধনখড়, একবার সিভি আনন্দ বোস, পরেরটাও করবে... সময়ের অপেক্ষা। আগামী মে মাসের পরে।’ অভিষেক আরও বলেন, ‘এর কারণ যেনতেন প্রকারে বাংলা দখল করতে হবে। তা বাংলা যদি দখল করতে হয়, যাও ১০ কোটি মানুষের ভোট নিয়ে এসো। মানুষ ঠিক করবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন। বিজেপির বুথে বসার লোক নেই, পার্টি অফিসে যাওয়ার লোক নেই, মিছিলে হাঁটার লোক নেই, পোস্টার মারার লোক নেই, হোর্ডিং লাগানোর লোক নেই। আর এরা বাংলা দখলের দিবাস্বপ্ন দেখছে।’ যদিও তৃণমূলের যুক্তি উড়িয়ে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘সিবিআই, ইডি, রাজ্যপাল— এ সবের ভরসায় বিজেপি রাজনীতি করে না। বিজেপির শক্তি বুথ স্তর পর্যন্ত পার্টির কার্যকর্তা-সমর্থকেরা। ফলে তৃণমূলের এ সব মনগড়া অভিযোগের কোনও জবাব হয় না। এ সব ওদের হতাশা।’
বোস নিজে এ দিন মুখ খোলেননি। ফলে তাঁর ইস্তফা নিয়ে রহস্য রয়েই গিয়েছে। সূত্রের খবর, এ দিন দিনভর দিল্লিতেই কাটিয়েছেন তিনি। রাজ্যের সরকারি অতিথিশালা বঙ্গ ভবনেই রয়েছেন তিনি। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন তিনি। রাজ্যপালের পদ খোয়ানোর পরে সম্মানজনক কোনও বিকল্পের খোঁজও করছেন। রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা, ইদানীং বাংলার তৃণমূল সরকার সম্পর্কে সুর নরম করে ফেলেছিলেন বোস। ভোটমুখী বাংলায় রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তাতে খুশি ছিল না। সেই কারণেই কি তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো— প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে। তৃণমূলনেত্রী মমতা ইতিমধ্যেই পদত্যাগের পিছনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘হাত’ থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশ এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘প্রথমে ২০২৫–এর জুলাইয়ে উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরানো হলো জগদীপ ধনখড়কে। তাঁর উত্তরসূরি সিভি আনন্দ বোসও একই ট্রিটমেন্ট পেলেন। হচ্ছেটা কী?’
সূত্রের খবর, রবি খুব শিগগিরই বাংলার রাজ্যপালের দায়িত্বভার নেবেন। তবে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে গত চার বছর ধরে আরএন রবির সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয় সে রাজ্যের শাসকদল ডিএমকের। সম্প্রতি জাতীয় সঙ্গীত, বিধানসভা অধিবেশনে ভাষণ-সহ নানা বিষয়েও মতানৈক্য প্রকট হয়েছে দু’তরফের। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন রীতি মেনে স্বাধীনতা দিবসে রাজ্যপালের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে চা-চক্র বয়কটও করেছেন
রবি আইপিএস অফিসার হিসাবে অবসর নেওয়ার পরে ২০১৯-এ তাঁকে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ২০২১–এর ১৮ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হন। বর্তমানে তিনি সেই পদেই রয়েছেন। রবির কেরিয়ারগ্রাফে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ২০১৫-এ ভারত সরকার ও ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত নাগা ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট। যদিও এক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি সেনাকে ব্যবহার করে নাগাল্যান্ডে বিরোধী আন্দোলন দমিয়ে দিতে চাইছেন।
I