এই সময়: চারতলা আবাসনের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস ছিল মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে অভিষেক শিকদার (৫০) ও তাঁর মা ছবি শিকদারের (৭৫)। । আর তারই জেরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় মা ও ছেলের। এমনই ভয়াবহ ঘটনার এ দিন সাক্ষী হয়ে রইল দমদম নাগেরবাজারের সাতগাছি এলাকা।
ঘটনার বিবরণ দিতে দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ দমদম পুরসভার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের এনএন রোডের ওই আবাসনের চারতলায় থাকতেন অভিষেক ও তাঁর মা। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, মা ও ছেলে উভয়েই বহুদিন ধরে মানসিক অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। এর পাশাপাশি দু’জনেই মানসিক ভারসাম্যহীনতাতেও ভুগছিলেন। শুক্রবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ হঠাৎই ওই আবাসনের চারতলার জানলা দিয়ে আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে দেখেন স্থানীয়রা। আতঙ্কিত বাসিন্দারা তৎক্ষণাৎ নাগেরবাজার থানা এবং দমকলকে খবর দেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছয় দমকলের দু’টি ইঞ্জিন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু হয়। তবে সেই কাজটি সহজ হয়নি। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে ঘরের দরজা ভেঙে উদ্ধারকারীরা ভিতরে ঢুকে দেখেন, ঘরের মেঝেয় মা ও ছেলের দগ্ধ দেহ পড়ে রয়েছে।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, অভিষেক উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। কিন্তু গত বেশ কিছু বছর ধরে মা ও ছেলে দু’জনেই চরম মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁদের মেলামেশা ছিল না বললেই চলে। কী ভাবে আগুন লাগল, তার সম্ভাব্য কারণ জানাতে গিয়ে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ফ্ল্যাটের সিঁড়িতে আবর্জনা জড়ো করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর অভিষেক তাঁদের ফ্ল্যাটের দরজা ভিতর থেকে লক করে দেন।
নাগেরবাজার থানার এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, ‘প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়েই মৃত্যু হয়েছে। তবে, দু’জনের দেহই বেশ কিছু জায়গায় পুড়েও গিয়েছিল।’ এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত আত্মহত্যা— সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে মৃত্যুর সঠিক কারণ স্পষ্ট হবে।’ ফ্ল্যাটের সিঁড়িতে কেন এবং কী ভাবে আবর্জনা এলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কাউন্সিলর কেয়া দাস বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। কী করে এমন হলো বুঝতে পারছি না!’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অচেতন ও দগ্ধ অবস্থায় অভিষেক এবং তাঁর মা ছবিকে উদ্ধার করে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের কিছুই করার ছিল না। দু’জনকেই হাসপাতালে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। স্থানীয়দের একাংশের অনুমান, অভিষেক নিজেই হয়তো আবর্জনায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পরে সেই আগুন ফ্ল্যাটের ভিতরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হলে তাঁরা বেরোনোর চেষ্টা করেও পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানিয়েছেন, এ দিন দুপুরে যখন আগুন লাগে তখন ভিতর থেকে বাঁচার আকুতি শোনা গিয়েছিল। কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় কিছুই করার ছিল না।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শহর ও শহরতলি এলাকার বিভিন্ন আবাসনে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বসবাসকারী মানসিক ভাবে অসুস্থ এবং প্রবীণদের নিরাপত্তা নিয়ে ফের একবার প্রশ্ন তুলে দিল।