পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে অনুযোগের সুর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর গলায়। প্রোটোকল ভেঙে স্বাগত জানাতে না আসা, পছন্দের জায়গায় সভা করতে না দেওয়া-সহ একাধিক বিষয়ে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি মুর্মু। সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করে তিনি বলেন,‘জানি না, মমতা আমার উপর কেন রাগ করেছেন।’
গোঁসাইপুরে সভা শেষ করে বিধাননগরে গিয়ে সংবাদ মাধ্যমের সামনে রাজ্য সরকার এবং তাদের ব্যবস্থাপনার বিপুল সমালোচনা করেন রাষ্ট্রপতি। যা দেখে ওয়াকিবহল মহলের অনেকেই বলছেন, অতীতে ভারতের কোনও রাষ্ট্রপতি এত আক্রমণাত্মক বক্তব্য হয়তো কোনও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেই করেননি। ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। পাশাপাশি, প্রশাসনিক মহলেও তীব্র হৈচৈ শুরু হয়েছে বলে খবর।
শনিবার শিলিগুড়ি মহকুমার বাগডোগরা সংলগ্ন গোঁসাইপুরের একটি মাঠে শনিবার আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের নবম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে যোগ দিতে এ দিন বিশেষ বিমানে বাগডোগরা এসে পৌঁছন রাষ্ট্রপতি। সেখান থেকে সড়কপথে গোঁসাইপুরে যান। সেখানে প্রকৃতি রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণও করেন তিনি। এর পরে বক্তব্য রাখতে উঠে আদিবাসী ও সাঁওতাল সমাজের হয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে ফুটে ওঠে একরাশ বিরক্তি । এক সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এই সভায় যতজন রয়েছেন, তার থেকে আরও বেশি মানুষ থাকতে পারতেন। আমি দেখছি বাইরে অনেকেই ঘোরাঘুরি করছেন, কিন্তু ভিতরে ঢুকতে পারছেন না। হয়তো কোনও কোনও মহল চাইছে না আদিবাসী ও সাঁওতালরা এই সভায় আসুক।’ অনেকের মতে রাষ্ট্রপতির কটাক্ষের তির ছিল রাজ্য সরকারের দিকেই।
এর পরে সভা শেষ করে গোঁসাইপুর থেকে সড়কপথে বিধাননগর চলে যান তিনি। উল্লেখ্য কাউন্সিলের তরফে বিধাননগরের একটি মাঠেই প্রথমে সভার জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছিল জেলা প্রশাসনের কাছে। কিন্তু নিরাপত্তা জনিত কারণে বিধাননগরের পরিবর্তে সভার স্থান হিসেবে গোঁসাইপুরকে চূড়ান্ত করে প্রশাসন। বিধাননগরে গিয়ে সরাসরি সংবাদ মাধ্যমের সামনে একরাশ ক্ষোভ উগরে দেন সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রধান। তিনি বলেন,‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার বোনের মতো। কিন্তু তিনি হয়তো কোনও কারণে আমাকে অপছন্দ করছেন। আমার উপর হয়তো কোনও অজানা কারণে রাগ করেছেন। আসলে প্রোটোকল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কোনও রাজ্যে গেলে সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং রাজ্যপালের সেখানে থাকার কথা। যেহেতু এই সময়ের মধ্যেই রাজ্যপাল পদত্যাগ করে নতুন রাজ্যপাল যোগদান করছেন, সেজন্য হয়তো রাজ্যপাল আসতে পারেননি। কিন্তু মন্ত্রিসভার কেউ না আসাটা প্রোটোকল ভঙ্গের সামিল।’ রাষ্ট্রপতিকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব।
এখানেই শেষ নয়, রাষ্ট্রপতি মুর্মু সভার মাঠ নিয়েও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে এত বড় মাঠ রয়েছে, সভা করতে তো কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না। আসলে রাজ্য প্রশাসন হয়তো চায়নি, বড় মাঠে সভা হোক বেশি মানুষ আসুক। সেই জন্য আমাদের পছন্দের জায়গায় সম্মেলন করতে দেওয়া হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার ছোট বোনের মতো। আমিও বাংলারই মেয়ে। বাংলার মানুষকে আমি ভালোবাসি। মমতা বোধহয় রাগ করেছেন, তাই আমাকে স্বাগত জানাতে তিনি নিজে আসেননি, কোনও মন্ত্রীও আসেননি। যাই হোক, এটা ব্যাপার নয় কোনও।’
প্রতি বছর আদিবাসী সম্প্রদায়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত থাকেন তাঁদেরই প্রতিনিধি, দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। এ বছর শিলিগুড়ির বিধাননগরে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানেই শনিবার যাওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রপতির। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রধানের নিরাপত্তা ও অন্যান্য বেশ কিছু কারণে বিধাননগরে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই তাঁর জন্য বাগডোগরা বিমানবন্দরের কাছে গোঁসাইপুরে সভাস্থল নির্দিষ্ট করা হয়।
এ দিনের অনুষ্ঠানে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের কার্যকারী সভাপতি নরেশকুমার মুর্মু-সহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি তৃণমূলের রোমা রেশমি এক্কা। তিনি বলেন,‘আয়োজকদের সঙ্গে আমাদের কিছু ক্ষেত্রে আমাদের যোগাযোগের অভাব হয়েছে। আমাদেরকে তো সে ভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। স্থানীয় বিজেপির বিধায়ক-সাংসদরা ছিলেন, তাঁরাও আমাদের বলতে পারতেন কী কী করতে হবে। তাঁরা তো একবারের জন্য মাঠেই আসেননি। গত কয়েকদিন থেকে এই সম্মেলনের জন্য আমি নিজেও তো অনেক খেটেছি। রাষ্ট্রপতি বলেন, আদিবাসীরা উপেক্ষিত। সেটা হয়তো ঠিকই। আমাদের সমাজের মানুষরা একটু লাজুক হয়। সেই কারণে ওদেরও অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়।’
বিজেপির তরফেও এই বিষয়ে আক্রমণ করা হয় মুখ্যমন্ত্রীকে। দলের তরফে বলা হয়,‘আজ রাষ্ট্রপতিকে অপমান করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অপমান মানে ১৪০ কোটি ভারতীয়র অপমান।’