• তৃণমূলের সরকার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করছে, বললেন মোদী! রাষ্ট্রপতির প্রতি ‘লজ্জাজনক ও বেনজির অসম্মান’ নিয়ে পোস্ট
    আনন্দবাজার | ০৭ মার্চ ২০২৬
  • উত্তরবঙ্গ সফরে এসেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। আর সেই সফরে তাঁর প্রতি তৃণমূল পরিচালিত রাজ্য সরকারের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের এক্স হ্যান্ডলে বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার সন্ধ্যায় নিজের সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে রাষ্ট্রপতির প্রতি পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের ব্যবহারের সমালোচনা করেন তিনি।

    শনিবার সন্ধ্যায় নিজের এক্স হ্যান্ডলে প্রধানমন্ত্রী মোদীর পোস্ট, ‘এটি লজ্জাজনক এবং নজিরবিহীন। গণতন্ত্র এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী মানুষজন সকলেই মর্মাহত। জনজাতি সম্প্রদায় থেকেই উঠে আসা রাষ্ট্রপতি মহোদয়ার প্রকাশিত বেদনা ও উদ্বেগ ভারতের মানুষের মনে গভীর দুঃখের সঞ্চার করেছে।’’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং রাষ্ট্রপতির প্রতি এই অসম্মানের জন্য রাজ্যের প্রশাসনই দায়ী। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সাঁওতাল সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অত্যন্ত হালকা ভাবে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘‘রাষ্ট্রপতির পদ রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং এই পদের মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করা উচিত। আশা করা যায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেসের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।’’

    শনিবার শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘‘জানি না, মমতাদির আমার উপর কেন রাগ!’’ একই সঙ্গে তিনি এ রাজ্যে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। উল্লেখ্য, পূর্বনির্ধারিত স্থানে অনুষ্ঠানটি হয়নি। যেখানে অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেখানে পর্যাপ্ত জায়গা নেই— এই যুক্তি দেখিয়ে অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। পরে রাষ্ট্রপতি ফাঁসিদেওয়ায় চলে যান। সেখানে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘‘প্রশাসনের মনে কী চলছিল জানি না। আমি তো সহজে এলাম। ওরা বলেছিল পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এখানে তো ৫ লক্ষ লোক হয়ে যাওয়ার কথা!’’

    এর পর মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘আমিও বাংলার মেয়ে। আমাকে বাংলায় আসতেই দেওয়া হয় না। মমতাদি আমার ছোট বোন। জানি না, আমার উপর কী রাগ। যাই হোক… কোনও অভিযোগ নেই। কোনও ক্ষোভ নেই। উনি ভাল থাকুন, আপনারাও ভাল থাকুন।’’ বাগডোগরা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মাঠে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রত্যাশিত ভিড় দেখা যায়নি। অধিকাংশ চেয়ারই ফাঁকা ছিল। এই প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘‘এটা যে একটা আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কনফারেন্স, দেখে মনেই হচ্ছে না!’’ একই সঙ্গে আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘‘আমার দেখে মনে হচ্ছে না, সাঁওতাল সমাজ বা আদিবাসী সমাজের মানুষেরা সরকারি কোনও সুযোগ-সুবিধা পান। আদৌ সরকারি সব সুবিধা তাঁরা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।’’

    এর পর রাষ্ট্রপতি যান ফাঁসিদেওয়ার বিধাননগরে। যেখানে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে প্রশাসন অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়নি বলে জানা যায়। সেখানে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘‘এখানে ছোট জায়গার জন্য অনুমতি মেলেনি বলে জেনেছি। কিন্তু এখানে তো কয়েক লক্ষ মানুষ শামিল হতে পারবেন। আমি আসতে চাই। কিন্তু জানি না আমার উপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এত রাগ কেন? আমিও এই বাংলারই মেয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার বোনের মতো।’’ রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যের জবাব দেয় তৃণমূল কংগ্রেসও। দলীয় বিবৃতিতে আদিবাসী উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরে তৃণমূল দাবি করে, রাষ্ট্রপতি ভুল ধারণা পোষণ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে মাননীয় রাষ্ট্রপতি মনে করছেন বাংলায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য কোনও উন্নয়ন হয়নি। আমরা সম্মানের সঙ্গে তথ্য তুলে ধরতে চাই— লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে আদিবাসী মহিলাদের মাসিক আর্থিক সহায়তা ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রত্যেক আদিবাসী মহিলা এখন মাসে ১,৭০০ টাকা পান, বছরে পান ২০ হাজার ৪০০ টাকা।’’ এ ছাড়াও শিক্ষাশ্রী, জয় জোহার-সহ রাজ্য সরকারের একাধিক প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তৃণমূল দাবি করে, ওই সব প্রকল্পের সুবিধা পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সম্প্রদায়ের বহু মানুষ পাচ্ছেন।

    শনিবার রাতেই ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে রাষ্ট্রপতির মন্তব্যের জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘মাননীয় রাষ্ট্রপতিকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু তাঁকে দিয়েও রাজনীতি করানো হচ্ছে। বিজেপির এজেন্ডা পাঠানো হয়েছে। আমি দুঃখিত ম্যাডাম, আপনার প্রতি আমার যথেষ্ট সম্মান আছে। কিন্তু আপনি বিজেপির ট্র্যাপে পড়ে গিয়েছেন।’’ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘আমরা নাকি কাউকে যেতে দিইনি। এটা তো রাজ্য সরকারের অনুষ্ঠান ছিল না। কোন সংগঠন অনুষ্ঠান করছে, সেটা আমি জানি না। আমি তো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ধর্নায় বসে আছি।’’ তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘‘মণিপুরে যখন আদিবাসীদের উপর অত্যাচার হচ্ছিল তখন কেন প্রতিবাদ করা হয়নি? দেশের অন্য রাজ্যে আদিবাসীদের উপর অত্যাচার হলে চুপ থাকা হয়, আর বাংলাকেই শুধু নিশানা করা হয় কেন?’’

    রাষ্ট্রপতির মন্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা জবাব এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া— সব মিলিয়ে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের আবহ তৈরি হয়েছে।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)