মণিরাজ ঘোষ
International Women's Day ১১ বছরে বিয়ে, সংসারের হাল ধরতে চালাতে হয় টোটো। মাথায় ১৩টি কলসি নিয়ে আমেরিকা পাড়ি দেওয়াই ‘স্বপ্ন’ শালবনির (Shalbani Paschim Medinipur) বিজলি মুর্মুর (Bijali Murmu)। বাবা-মা দু’জনই ছিলেন দিনমজুর। ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার। মাত্র ১১ বছর বয়সেই তাই ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন জুটিরাম ও সরজু। স্বামীর ঘরেও তেমন আর্থিক জোর নেই। শ্বশুরবাড়িতে এসে টোটো চালানো শেখেন বিজলি। আর শেখেন মাথায় একাধিক কলসি নিয়ে নাচ। সেই ব্যালান্সের নাচ তাঁকে এনে দিয়েছে দেশজোড়া খ্যাতি। পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনির সেই মেয়ে কলসি মাথায় এখন আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
১১ বছর বয়সে বিয়ে করে পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে আসেন বিজলি। তখন বিয়ের মানেও বুঝতেন না। স্বামী জমাদার মুর্মুও দিনমজুর। প্রথম প্রথম স্বামীর সঙ্গেই নানা কাজে গিয়েছেন। ১৬ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন বিজলি। বছর পাঁচেক পরে জন্ম হয় ছোট ছেলের। নিজে কোনওদিন বিদ্যালয়ের চৌকাঠ না পার করলেও দুই ছেলেকেই শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন।
সেই ছেলেদের পড়াশোনার খরচ চালাতেই টোটো চালানো শুরু। শালবনির প্রথম মহিলা টোটো চালক বিজলিই। ছেলেদের স্কুলে অভিভাবকদের খেলায় গুলি-চামচ দৌড়ে প্রতি বছর প্রথম স্থানটিও ছিল তাঁর নিশ্চিত। সেই সাফল্যে উৎসাহিত হয়েই ক্রীড়াবিদ হিসেবে জঙ্গলমহল তথা সারা রাজ্যে নানা সাফল্য অর্জন করেছেন বছর ৪৩-র গৃহবধূ বিজলি। যদিও, ফুটবল বা দৌড় প্রতিযোগিতা নয়, তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় মাথায় কলসি নিয়ে নাচ।
একটা, দুটো, তিনটে দিয়ে শুরু করে শালবনির বিজলি এখন মাথায় ১৩টি কলসি নিয়ে নাচ করেন। তাঁর সেই নাচে মুগ্ধ দেশ-বিদেশের মানুষ। রাজ্য ও জাতীয় স্তরে একাধিক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন বিজলি। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস বিজলিকে তিন তিন বার পুরস্কৃত করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লির আম্বেদকর ভবনে অলচিকি হরফের একশো বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সামনে নিজের নৃত্যশৈলী পরিবেশন করেছেন বিজলি। যদিও, বিজলির এখন এক এবং একমাত্র লক্ষ্য আমেরিকার বিখ্যাত রিয়ালিটি শো America's Got Talent-এর হাত ধরে সেই দেশে পাড়ি দেওয়া।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রথম অডিশন দেন বিজলি। সময় পেয়েছিলেন মাত্র দেড় মিনিট। অসাধারণ শৈলীতে বিচারকদের মুগ্ধ করলেও সে বার মনোনীত হননি। এ বছর জানুয়ারিতে ফের অডিশন দিয়েছেন বিজলি। আমেরিকার ওই রিয়েলিটি শো-র তরফে জানানো হয়েছে, সিলেক্ট হলে ই-মেল করা হবে। তবে সিলেক্ট না হলেও জানানো হবে। সে ক্ষেত্রে আবারও অডিশন দিতে হতে পারে তাঁকে।
বিজলি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত জানানো হবে। প্রয়োজনে আবারও অডিশন দেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত। ওটা আমার জীবনের একটা স্বপ্ন।’ ২০১৮ সালে বিজলি যখন টোটো কেনেন, শালবনিতে তখন মাত্র ৫টি টোটো। চার জনই পুরুষ চালক। একমাত্র মহিলা তিনি। ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনা যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তখনও তিনি টোটো চালিয়ে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। বহু রোগীকেও শালবনি থেকে মেদিনীপুর নিয়ে গিয়েছেন।
২০২২ সালে বাংলার জনপ্রিয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের রিয়ালিটি শোয়ের অডিশন দিতে শিলিগুড়ি চলে গিয়েছিলেন একা একা। সেই শোয়ে নম্বর ওয়ান হন এই দিদি। এ ভাবে বিজলির এগিয়ে যাওয়ায় দুই ছেলে বড় ভরসা, জানান বিজলি নিজেই। বড় ছেলের বয়স এখন ২৬-২৭। মেদিনীপুর কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স করে এখন সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ছোট জন মাধ্যমিক পাশ করার পরে ফুটবলের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
বিজলি বলেন, ‘আপনি যদি মন থেকে কোনও কিছু করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন, তা যে ভাবে হোক পূরণ হবেই। টাকা-পয়সা আটকাবে না, আমি ঠিক চেয়েচিন্তে জুটিয়ে নেব।’ একদিন জঙ্গলমহলের এই বিজলিই আলোকবর্তিকা হয়ে ছুটবে আমেরিকায়। এ মেয়ের নামেই বিদ্যুৎ খেলে। চোখে-মুখে সেই আলোর ঝলক। শালবনি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নেপাল সিংহ বলেন, ‘অন্ধকারেও উজ্জ্বল শালবনির বিজলি। উনি আমাদের গর্ব। আমরা ওঁর পাশে থাকব।’