• নারীর নিজের পরিচয় হলো কই!
    এই সময় | ০৮ মার্চ ২০২৬
  • বিশিষ্ট নারীবাদী লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর অতি বিখ্যাত প্রবন্ধে মেয়েদের একান্ত নিজস্ব একটি ঘরের খোঁজ করেছিলেন যে ঘরটুকু পেলে মেয়েদের প্রতিভা বিকশিত হয়। নিজের জন্য বিশেষ একটি ঘর দূরে থাক, মেয়েদের মাথা গোঁজার আশ্রয়টুকুতেও তার অধিকার কতটুকু সেটাই আজ বিবেচনাধীন। ‘স্ত্রীর পত্র’, যাকে বাংলা সাহিত্যে নারীমুক্তির অন্যতম দলিল হিসেবে ধরা হয়, সেখানে মুক্তির পথে এগিয়ে মৃণাল তাঁর স্বামীকে লেখা চিঠির শেষে নিজের বিশেষণ দিয়েছেন ‘তোমার চরণতলাশ্রয়চ্ছিন্ন’ যেটি একটি অসাধারণ শব্দবন্ধ। স্বামীর চরণতলেই মেয়ের আশ্রয় যেমনটি বিয়ের আগে পিতার ঘরে। বিয়ের পর মেয়ের যাবতীয় পরিচয় নির্ধারিত হতে থাকে তার স্বামীর পরিবার দ্বারা। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই স্বাভাবিক চলনটিই যখন মেয়েদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে, তখন সে কোথায় দাঁড়াবে!

    গত কয়েক মাসে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য জুড়ে তোলপাড় চলছে নিজেদের পরিচয় রক্ষায়। গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলিতে প্রাক্তন ছাত্রীরা ভিড় করছেন, চাইছেন তাঁর স্কুলে পড়ার একটি প্রমাণপত্র। এমন নয় যে নির্বাচন কমিশন ঠিক এই প্রমাণ চেয়েছেন। নির্বাচন কমিশন ভোটার প্রমাণের জন্য যে নথিপত্র চেয়েছেন, এটা স্পষ্ট যে তার বেশির ভাগটাই মেয়েদের কাছে নেই। এর মধ্যে অন্যতম হল মাধ্যমিক বা সমতুল্য পরীক্ষা পাশ করার সার্টিফিকেট। শেষ জনগণনা যেটা হয়েছে ২০০১ সালে, সেখানে ৪১.৩ শতাংশ মেয়ে মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন, অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি মেয়ের পড়াশোনার তার আগেই ইতি হয়েছে। মেয়েদের লেখাপড়ার হাল যে কি তা সবাই জানেন। ঘরের কাছে প্রাথমিক স্কুলে পড়াশোনা শুরু হয়, তারপর খানিক দূরের হাইস্কুল, মোটামুটি অষ্টম শ্রেণির কাছাকাছি এলেই বিয়ের বাজনা বেজে ওঠে। তারপর সব শেষ।

    বিয়ে মানে শুধু লেখাপড়া শেষ নয়, বিয়ে মানেই স্থানান্তরিত হওয়া। খসড়া ভোটার তালিকায় বাদ পড়া মেয়েদের ৪৩.৭ শতাংশ বিয়ে বা অন্য কারণে স্থানান্তরিত হয়েছেন। তার পর তাঁর যাবতীয় পরিচয় যুক্ত হয়েছে স্বামী এবং তার পরিবারের সঙ্গে। পদবি বদলেছে, আধার কার্ডে বাবার বদলে স্বামীর নাম এসেছে। কিন্তু এখন তাঁকে ভোটার হতে গেলে তাঁর বাবার নামের সঙ্গে যুক্ত পরিচয় প্রয়োজন। যেহেতু অন্য কোনও নথি কাজে আসছে না, তা হলে তাঁর পরিচয়ের শেষ ভরসাটুকু আটকে আছে সেই স্কুলে, যেখানে তাঁর সফর অসমাপ্ত। স্কুলের বহু পুরোনো নথিপত্রের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজতে আসা এই মেয়েদের অসহায়তা কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে কল্যাণকর নয়। সবচেয়ে বেদনার বিষয় এই যে, এই মেয়েরা অনেকেই ভুলে গেছেন কোন বছরে তাঁরা ভর্তি হয়েছেন, শেষ কোন ক্লাসে পড়েছেন। স্কুলে পড়ার কোনও স্মৃতিই তাঁদের কাছে নেই, সব কাগজ হারিয়ে গেছে নিজের শৈশব-কৈশোরের মতো।

    কেউ কেউ বহুকাল আগে ছেড়ে যাওয়া বাপের বাড়িতে এসে খোঁজ করছেন জমি সম্পত্তির কাগজ বা অন্য কোনও কাগজ যার দ্বারা বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রমাণ করা যায়। যাঁর মাধ্যমিক পাশের কাগজ আছে, কিন্তু সেখানে বাবার নামের বানানে হয়তো কোনও ভুল আছে, সঠিক নামের জন্য বহুকাল প্রয়াত বাবার কাগজ দরকার, সেটাই বা কে দেবে তাঁকে? এখন তো বাপের বাড়িও তাঁর নিজের বাড়ি নয়। তা হলে মেয়েরা যাবেন কোথায়?

    মেয়েদের নিজের পরিচয় বিয়ের পর সরকারি কাগজেও বদলায়। পদবি বদলায়, অভিভাবক বদলায়, কিন্তু আজ তাঁর প্রধান নাগরিক অধিকার সে কারণেই বিপন্ন। এ দেশে সংবিধান রচনার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েরা ভোটাধিকার পেয়েছিলেন, কেননা সংবিধান সভায় সমানাধিকারে বিশ্বাসী উজ্জ্বল নারী-পুরুষেরা ছিলেন। ইউরোপে ভোটাধিকারের জন্য মেয়েদের কঠিন লড়াই লড়তে হয়েছে। আজ অনেকেই সেই ভোটাধিকার হারাতে বসেছেন। কম শিক্ষিত প্রান্তিক মেয়েদের মধ্যে এই অবস্থা আরও প্রকট। আদিবাসী সমাজে স্ত্রী-পুরুষ সাম্যের একটি বিশেষ ধরন আছে। কিন্তু যেহেতু এই সমাজের বড় অংশ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত, তাঁদের হাতে যথেষ্ট নথিপত্র নেই। তার সঙ্গে আছে কাজের খোঁজে দেশান্তরী হওয়া। রুজি-রোজগারের জন্য ভিনরাজ্যে পাড়ি দিলে পরিবারের প্রধান, অর্থাৎ পুরুষটির নামই যাবতীয় কাগজপত্রে নথিভুক্ত হয়। এঁদের নামও সঠিক ভাবে ভোটার তালিকায় আসেনি, ফলে তালিকা থেকে বহু নাম বাদ পড়েছে।

    বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে অনুসরণ করেই এই বিশেষ সংশোধন চলছে প্রত্যক্ষ ভাবে যার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দরিদ্র, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, মূলত পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর মেয়েরা। কিন্তু এর জন্য কি এই মেয়েরা দায়ী, এটাই কিন্তু সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

    সামগ্রিক যে পরিচয়পত্র এত দিন সর্বজনগ্রাহ্য ছিল, সেটি আধার কার্ড। এ ক্ষেত্রে সেটি একক ভাবে কাজে আসছে না। খসড়া তালিকা প্রস্তুতির সময়ে নির্বাচন কমিশন যে নথিগুলো গ্রাহ্য করছে, এ দেশের খুব কম সংখ্যক মেয়ের কাছে সেগুলো পাওয়া যায়। কমিশন-গ্রাহ্য নথির মধ্যে জমির রেকর্ড বা কাস্ট সার্টিফিকেট আছে, এমন মেয়েরা সংখ্যায় হাতেগোনা।

    ২০১৬ সালের নারী দিবসে রাষ্ট্রপুঞ্জের আনুষ্ঠানিক প্রতিপাদ্য বা থিম হল অধিকার, ন্যায় এবং কাজ সকল নারী ও বালিকার জন্য। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী পুরুষেরা যে আইনি অধিকার পায়, তার মাত্র ৬৪ শতাংশ মেয়েরা পেয়ে থাকেন। যাঁরা পান না, তাঁদের বড় অংশই শ্রমজীবী প্রান্তিক নারী, যাঁদের পরিচয়যাপন সমস্তই অন্য ভাবে নিয়ন্ত্রিত। আজ এ দেশে নাগরিক হিসেবেও তাঁদের অধিকার বিপন্ন।

    নারীকে ‘আপন ভাগ্য জয় করিবার’ অধিকার তা হলে এই নারী দিবসেও দেওয়া গেল না!

  • Link to this news (এই সময়)